ঐতিহ্য হারাতে বসেছে কুমারখালীর ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প

চলমান সুতার বাজারে ঊর্ধ্বগতি দামের কারণে কুমারখালী তাঁত শিল্প অনিশ্চিয়তা পথে। এক সময়ের অর্থনৈতিক প্রধান চালিকা শক্তি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাপড়ের হাট হিসেবে সুপরিচিত কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের হাটটি নানা সমস্যায় আজ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

তাঁত শিল্পে সমৃদ্ধ ছোট জনপদ কুমারখালীর অর্থনৈতিক প্রধান চালিকাশক্তিই হচ্ছে তাঁত শিল্প। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি দেশের বস্ত্র খাতে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান আজও দখল করে রয়েছে।

এ তাঁত শিল্পে উৎপাদিত পণ্য ও বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বস্ত্রকে কেন্দ্র করেই ১৯৩৮ সালে কুমারখালী পৌর এলাকায় গড়ে ওঠে এই কাপড়ের হাট। যা পরবর্তীতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাপড়ের হাট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তখন এ হাটের যেমন ছিল সুনাম, তেমনই ছিল জৌলুস।

কালের বিবর্তনে বর্তমানে সেখানে এখন নিঃশব্দের নিরবতা । মাঝে মাঝে কয়েকটি তাঁত কল চললেও আগের মতো আর তাদের তাঁতে সুর ওঠেনা। ঠিকমতো সংসার চলে না। পেটের দায়ে পূর্বপুরুষের এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। সূত্র জানায়, তাঁত শিল্প নগরী খ্যাত কুষ্টিয়ার কুমারখালী, খোকসা ও মিরপুর, পাংশা , লাঙ্গল বাঁধ উপজেলায় প্রায় ৮০ হাজারেরও অধিক তাঁতী ছিল। এরমধ্যে খটখটি তাঁত ১৪ হাজার হস্তচালিত পিটলং তাঁত ৪৪ হাজার ও বিদ্যুৎ চালিত ২০ হাজার প্রতি বছর ২শ’ ৬০ কোটি টাকা মূল্যের কাপড় তৈরি হত এ জেলায়।

ঐতিহ্য তাঁত শিল্পের শ্রমিকরা চরম দুর্দিনে মধ্যে রয়েছেন। তাঁত মালিকরা অর্থনৈতিক সঙ্কট, কাঁচামালের অভাব ও নানান প্রতিকূলতার কারণে জেলার এককালের প্রসিদ্ধ এই তাঁত শিল্প বিলুপ্ত হতে চলেছে। ফলে এ শিল্পের সাথে জড়িত লক্ষাধিক শ্রমিক এখন বেকার হয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।

২ কোটি ৮৮ লাখ পিস লুঙ্গি, ১৫ লাখ পিস বেডকভার, ৭২ লাখ পিস গামছা তোয়ালে উৎপাদন হত। এক সময় এ জেলায় বস্ত্রশিল্পের বার্ষিক আয় ছিল ৩শ’ কোটি টাকার উপরে। দেশের মোটা কাপড়ের চাহিদার ৬৩ ভাগ পূরণ করতো কুষ্টিয়ার তাঁতীরা। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এ তাঁত কাপড়ের ছিল ব্যাপক চাহিদা।

বর্তমানে এ চাহিদা কমে ৩৫ ভাগে নেমে এসেছে। সব কিছুর দাম বাড়লেও আশানুরুপ তাঁতবস্ত্রের কোন দাম না বাড়ায় কুষ্টিয়ার ১ লাখ ১৪ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ৫০ হাজার তাঁত শ্রমিক পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এখনও পুরাতন পেশা হিসেবে এ পেশায় টিকে আছে কয়েক হাজার তাঁতী।

কুমারখালী টেক্সটাইল অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা জানান, দুই শ’ বছরের পুরোনো কুমারখালী তাঁত শিল্প লক্ষাধিক মানুষ এই শিল্পের সাথে জড়িত। পরিকল্পিতভাবে সুতার বাজারে দরপতন স্থানীয় বাজারে ব্যাকপ ভাবে প্রভাব বিস্তার করে। গ্লোবাল মার্কেটিং এবং বিকেএমইএ , বিজিএমইএ বন্ড মার্কেট কারণে সুতার দামের হেরফের হাওয়ায় স্থানীয় বাজারে সুতার দাম বেশি হচ্ছে।

কুমারখালী তাঁত বোর্ডের ব্যাবস্থাপক মেহেদী হাসান জানান, সম্প্রতি সময়ে কুমারখালী তাঁতিদের দূর দিন চলছে, এর প্রধান কারণ করোনা, এবং সুতার ও রং এর দাম বেশি। তাঁত বোর্ড একটি তাঁতি বান্ধব প্রতিষ্ঠান’ এই শিল্প কে বাঁচাতে হলে অবশ্যই কাঁচামালের মূল সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। এই বিষয় কে মাথায় রেখেই কুমারখালী তাঁত বোর্ডকে আধুনিক করণের কাজ চলছে।

কুমারখালী উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা বিতান কুমার মন্ডল জানান, কুমারখালী তাঁত শিল্প একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প, কিছু দিন ধরে শুনতে পারছি এই শিল্পের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেহেতু এটা জাতীয় ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা না হলে ঐতিহ্যবাহী এই পোশাক শিল্প খাতটি ধংষ হয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।