যে চলচ্চিত্র গুলো আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়; পর্ব -১

আনতারা রাইসা: আমাদের জীবন সবসময় একই স্রোতে চলেনা। কখনও আসে সুখ, কখনও দুঃখ। কখনও বা এক ঝড় এসে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু জীবনে চলার পথে আমাদের থেমে থাকলে চলেনা। জীবনে যত দুঃখ- কষ্ট যাই আসুক না কেন, আমাদের সব কিছুর সাথে যুদ্ধ করেই এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এই যুদ্ধ করার জন্য আমাদের দরকার হয় অনুপ্রেরণার। অনুপ্রেরণা আমাদের জীবনের চলার পথের অন্যতম শক্তি। একটু উৎসাহ, একটু অনুপ্রেরনাই পারে ঝড়ে হারিয়ে মানুষকে আবার ঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে। সে শক্তি পায় নতুন কিছু করার। নতুন ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর। আমাদের মনে রাখতে হবে জীবনে আমাদের যত ঝড় ঝঞ্ঝাট ই আসুক না কেন আমাদের থেমে পড়া যাবেনা। বারবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এখানেই জীবনের সার্থকতা। অনুপ্রেরণার জন্য সবচেয়ে সহজ মাধ্যম চলচ্চিত্র। কারণ একমাত্র সুন্দর এবং নান্দনিক ছবি ই আমাদের পারে আবার হতাশার দ্বারপ্রান্ত থেকে আমাদের ফিরিয়ে আনতে। ছবিতে দেখানো জীবন যুদ্ধে বারবার হারতে থাকা মানুষটি যখন সাফ্যলের দেখা পায় সেই জায়গায় আমরা সবাই নিজেদের কল্পনা করে অনুপ্রেরণা পাই। আমাদের মনে হয় আমরাও পারব। এমন ই কিছু অনুপ্রেরণা মূলক ছবির গল্পই আজ আপনাদের বলবো। মোট দশটি ছবির কথা বলা হবে দুই পর্বে। আজ আমাদের প্রথম পর্ব।

১। শশাঙ্ক রেডেম্পশন (১৯৮৪)

খুব সোজা ভাষায় বললে এই ছবিটি জেলখানা থেকে মুক্তির গল্প। ছবিটি আড়াই ঘণ্টা হলেও আপনার একবারও একঘেয়ে লাগবেনা। মূলত জেলখানা থেকে মুক্তিই সিনেমার মূল বক্তব্য নয়। এখানে বলা হচ্ছে জীবন থেকে বাঁচো। জীবনকে তার চাহিদার পথে উন্নীত করো। আশায় বাঁচো। আশা এই ছবির একটি অন্যতম মূল বক্তব্য। জীবনে যা কিছুই ঘটে যাক কখনও আশা ছেড়ে দিও না। নিস্তেজ আশাটুকুকে বাঁচিয়ে রাখো। হাল ছেড়ে দিও না। এখানে আরো তুলে ধরা হয়েছে জেলখানার পরিবেশে বেড়ে ওঠা কয়েদিদের জীবনের গল্প। গল্প আবর্তিত হয়েছে ব্যঙ্কার এন্ড্রি ডুফারসনের ১৯ বছরের কয়েদি জীবন নিয়ে। তবে এই ছবিতে প্রতিটি চরিত্রেরই রয়েছে এক আলাদা জগত, আলাদা গল্প। তবে ছবিটিকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে অভিনেতা মর্গান ফ্রিম্যান । তার অনুপ্রেরনামুলক কথাগুলির জন্য ছবিটি যেন প্রাণ পেয়েছে। একজন কয়েদী যদি তার জীবনের ৪০ টা বছরই জেলে কাটিয়ে দেয় তাহলে কেমন হয় তার চিন্তাধারা? এই বিষয়টি ও তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে। জেলের সাথে কতটা মিশে গেলে একজন লোক মুক্তি পেতে চায় না? কতটা মিশে গেলে একজন লোক বাকি জীবন জেলে থাকার জন্য আবার নতুন করে অপরাধ করতে চায়? কতটা মিশে গেলে জেলের বাইরের জীবন পানসে হয়ে যায়? ছবির মূল চরিত্র কিভাবে তার কয়েদি জীবন থেকে পালিয়ে এলেন দীর্ঘ ২০ বছর অপেক্ষা করে? কীসের আশা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল?  এসব জানতে দেখতে হবে ছবিটি।

২। পারস্যুট অফ হ্যাপিনেস

দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর ও যখন একটি ভালো চাকরি হয়না , যখন সংসারে স্ত্রী, সন্তান কিন্তু তাদের খেতে দেয়ার মত টাকা নেই হাতে , সন্তানের ছোটখাটো কোনো শখ পূরণের সামর্থ্য নেই, যখন সংসারের চাকা থমকে যায় তখন কিভাবে এই দুর্যোগ, এই হতাশা কাটিয়ে ওঠা যায়? জানতে দেখতে হবে এই ছবিটি। এই ছবিতে  উদ্যোক্তা ক্রিস গার্ডেনারের জীবনের এক বছরের কঠিন সংগ্রামের সত্য চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক গ্যাব্রিয়েল মুচিনো।ক্রিস গার্ডেনার যেন বর্তমান প্রজন্মের প্রতিটি উদ্যোক্তার জীবনযুদ্ধের প্রতীক।   ছবির গল্পে দেখা যায় এক সেলসম্যান তার স্ত্রী এবং সন্তান কে নিয়ে টাকার অভাবে খুবই কষ্টের জীবন যাপন করছেন। প্রতিদিন তার যে স্ক্যানার বিক্রি করার কথা তা তিনি করতে পারছেন না। এক পর্যায়ে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায় আর তিনি তার এক সন্তান নিয়ে জীবন যুদ্ধে নামেন। তবে গল্পের শেষে কি হয়েছিল জানতে দেখুন ছবিটি। কিভাবে জীবনের কিছু ছোট সিদ্ধান্ত মানুষের জীবন পাল্টে দেয় পুরোপুরি।

৩। এ বিউটিফুল মাইন্ড (২০০১)

একজন গণিতবিদের জীবন যাত্রায় তার প্রতিনিয়ত আত্ম উপলদ্ধির গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে ছবিটি । মানব আবেগের বিভিন্ন মুখোশ এখানে উন্মোচন করা হয়েছে । এই ছবিটি জন ফোর্বস ন্যাশ এর জীবনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত যিনি ১৯৯৪ সালে নোবেল জিতেছিলেন অর্থনীতিতে। এই ছবিতে দেখা যায় ন্যাশ প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন । কিন্তু সেখানে তার সহপাঠীদের সাথে তার বেশ দুরত্ব থেকে যায়। কারণ জাগতিক জীবনের চেয়ে তাকে সংখ্যাই বেশি টানে। অতি মেধাবি এই ন্যাশ এক পর্যায়ে সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত হন। যদিও পরে তিনি তার স্ত্রী  এবং বন্ধুদের বদৌলতে সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন এবং তিনি নোবেল পুরস্কার ও জিতেন। ছবিতে ফুটে উঠেছে সব বাঁধা মোকাবিলা করে কিভাবে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।

৪। ফরেস্ট গাম্প

১৯৮১ সালের  ঘটনা, বোকাসোকা ফরেস্ট গাম্প বাস স্টেশনে বসে একের পর এক তার জীবনের সব কাহিনী বলে যেতে থাকে। ঘটনাক্রমে ইউএস আর্মিতে যোগদান করা, এক সহযোদ্ধার জীবন বাঁচানো (যে আদৌ সেই পঙ্গুত্বের জীবন নিয়ে বাঁচতে চায়নি), রাগবী তারকা হয়ে ওঠা, বন্ধুর কথায় চিংড়ি মাছের ব্যবসা শুরু করা, ভালোবাসার মানুষ জেনির সাথে হিপ্পিদের মতো জীবনযাপন করা, ফলের ব্যবসা ভেবে অ্যাপল কোম্পানিতে টাকা বিনিয়োগ করা, ছোটবেলায় এলভিস প্রিসলিকে নাচ শেখানো, জন এফ কেনেডির সামনে না বুঝেই নিজেকে হাসির পাত্রে পরিণত করা- কী না করেছে সে জীবনে! এক ঝুড়ি অর্জন নিয়েও দিনশেষে ফরেস্ট গাম্প সেই সাধারণ গাম্পই থেকে যায়, যে কিনা ব্যবসা থেকে অর্জিত লাভের অর্ধেক তার মৃত বন্ধুর পরিবারকে পাঠিয়ে দিতে একদম ভুল করে না, বান্ধবী জেনির শত উপেক্ষাও যার ভালোবাসা এক ফোঁটা কমাতে পারে না।

রবার্ট জেমেকিসের পরিচালনায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন হলিউডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস। সেরা অভিনেতা সহ সর্বমোট ১৪টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে ৬টি বিভাগে অস্কার জেতে ‘ফরেস্ট গাম্প’।

৫। থ্রি ইডিয়টস

বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে এখন আমরা একুশ শতকে। এখনো আমাদের পছন্দের তালিকায় পেশা হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার এগুলোকেই বেশি গুরত্ব দেয়া হয়। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে ভালোভাবে পড়ালেখা শেষ করে একটি চাকরি জোগাড় করাই অভিভাবকদের লক্ষ্য। তারা চান তাদের সন্তানরা সফল হয়ে সমাজে তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। তাই মনের অজান্তেই তাদের আশাগুলো চাপিয়ে দিচ্ছেন সন্তানদের ওপর। একবারও বোঝার চেষ্টা করছেন না তাদের সন্তানদের সে বিষয়টি পড়তে ইচ্ছা আছে কিনা। এর ফলে অনেক সময় ছেলে-মেয়েরা হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে। এই বিষয়টিই থ্রি ইডিয়টস মুভিটিতে দেখানো হয়েছে। তবে র‍্যাঞ্ছোর কাহিনী প্রথমে রহস্যময় থাকলেও পরে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে সকল কাহিনী। এরপর দর্শকদের তার প্রতি সহানুভূতির পাল্লা বাড়বে। সে যখন তার বন্ধু অর্থাৎ অন্য দুই ইডিয়টস রাজু এবং ফারহানের সাহায্যে এগিয়ে আসে তখন রাজু এবং ফারহানের অভিব্যক্তি শুধু র‍্যাঞ্ছোকেই অশ্রুসিক্ত করবে না সকল দর্শককেই অশ্রুসিক্ত করবে। ছবিটির  প্রথমেই লেখা ওঠে সকল চরিত্রই কাল্পনিক। আসলে কাল্পনিক লেখা থাকলেও প্রতিটি চরিত্রই যে বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি তা ছবিটি দেখলে বলার অপেক্ষা রাখে না।

অনলাইন নিউজ ডেস্ক/বিজয় টিভি