কৃষি উৎপাদন বাড়াতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর

কৃষি উৎপাদন বাড়াতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি না রাখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, যে যা পারেন উৎপাদন করেন। এক ইঞ্চি জমিও নষ্ট করবেন না। বাড়ির আঙিনায়, খোলা জায়গায় উৎপাদন করেন।

সরকার বিভিন্নভাবে চাষাবাদকে উৎসাহিত করছে জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্যের চাহিদা কখনও কমবে না। বরং বাড়বে। সামনে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেকেই খাদ্য সংকটে পড়বে। আমাদের যাতে সেরকম পরিস্থিতি না হয়। হয়তো অনেক দেশে আমাদেরই খাদ্য সহায়তা পাঠাতে হবে। সেদিক চিন্তা করে আমাদের কাজ করতে হবে।

বুধবার (১২ অক্টোবর) বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। অনুষ্ঠানস্থলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মতিয়া চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

দেশের ৪৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে আজ। কৃষিক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ও অনুকরণীয় অবদান রাখায় ১৪২৫ বঙ্গাব্দের জন্য ১৫ এবং ১৪২৬ বঙ্গাব্দের জন্য ২৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার দেওয়া হলো।

জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন বাংলাদেশ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল আমরা কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবো। কিন্তু আমাদের আগে যত সরকার ছিল তাদের সবার একটা বিষয় ছিল যে এটা না করে কিছু লোককে দিয়ে ব্যবসা করাবে, আমদানি করবে, সাহায্য নেবে। জিয়ার সরকার, এরশাদের সরকার, খালেদা জিয়ার সরকার সবার কথাই আমি বলছি। ৯৬-এ ক্ষমতায় এসে লক্ষ্য নিলাম আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে।

তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালে বন্যা হয় দেশে। তখন বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বলেছিল, দুই কোটি মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। আমরা বলেছিলাম একজনও মারা যাবে না। ৬৯ দিন ছিল বন্যা। যেসব এলাকায় বন্যা ছিল না সবখানে ধানের চারা রোপণ শুরু করি। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই এয়ারফোর্সের মাধ্যমে সবখানে বীজ পৌঁছে দেই। সেই বছরই প্রথম বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।

আগের সরকারগুলোর মানসিকতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই বলতো বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে বিদেশ থেকে খাদ্য সাহায্য পাওয়া যাবে না। খালেদা জিয়াও বলেছিল। তারা মনে করতো, স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে তো ভিক্ষা পাওয়া যাবে না। তবে আমি মনে করি, ভিক্ষা করে না, আমরা মাথা উঁচু করে চলবো। নিজের মাটিতে উৎপাদন করে, আত্মনির্ভর হয়ে চলবো। নিজেদের মর্যাদা নিয়ে আমরা চলতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বেঁচে থাকলে দেশ অনেক আগেই এগিয়ে যেত। পাকিস্তানে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যখন দেশে ফিরলেন, একটি ডলারও রিজার্ভ মানি ছিল না। ক্যাশ টাকা ছিল না। খাবার ছিল না। রেললাইন-সেতু সব ধ্বংস। সমস্ত দেশটা একটা ধ্বংসস্তূপ। তবে বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল ক্ষুদা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ে তুলবেন। তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা হবে না। কৃষিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কৃষি উৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতিটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর একমাত্র লক্ষ্য।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর সময়ে কৃষিতে পুরস্কার প্রবর্তন হয়। তবে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কারের নাম পরিবর্তন হয়েছে, পুরস্কারও শেষ। আমরা সরকারে এসে আবার পুরস্কার দেওয়া অব্যাহত রাখি।

সরকারপ্রধান বলেন, ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার যখন সরকারে আসি, কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে বিনা সুদে বর্গাচাষিদের ঋণ দিতে শুরু করি। কৃষিঋণ সহজ করে দেই। ব্যাংক কৃষকের কাছে যাবে, কৃষককে ব্যাংকের কাছে আসতে হবে না, এই ব্যবস্থা করে দেই।

তিনি বলেন, গবেষণা হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিষয়। ‘৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে দেখলাম, গবেষণার জন্য একটা টাকাও কখনও দেওয়া হয়নি। আমরা বরাদ্দ দেওয়া শুরু করলাম। এখন সেই গবেষণার ফলাফলই আমরা পাচ্ছি। ২০০৯ সালে যখন সরকার গঠন করি, এরপর থেকে কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। ভর্তুকিটাও অব্যাহত রাখি। এক কোটি কৃষক ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করেছে। তাদের ভর্তুকিটা আমরা পৌঁছে দেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানান, কৃষি খাতও ডিজিটাল করা হচ্ছে। কয়েকশ’ তথ্যকেন্দ্র করা হয়েছে। কৃষকরা মোবাইল ফোনে ছবি তুলে তথ্যকেন্দ্রে পাঠিয়ে দিয়ে সমস্যার কথা জানাতে পারছেন, সমাধান পাচ্ছেন।

পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ যেসব কৃষিপণ্য এখনও আমদানি করতে হচ্ছে, সেগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উত্তম কৃষিচর্চা নীতিমালা করেছি। ২০২৪ সালের মধ্যে লক্ষ্য ঠিক করা আছে। আগে পেঁয়াজ নিয়ে সংকট তৈরি হতো। এরপর আমরা পেঁয়াজ উৎপাদনে মনোযোগী হলাম। এখন পেঁয়াজ উৎপাদনে তৃতীয় স্থান দখল করেছি। এটা কীভাবে সংরক্ষণ করা যায় তা দেখতে হবে। ভোজ্যতেল বাইরে থেকে আনতে হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন কীভাবে করতে পারি সেটা দেখতে হবে। আমাদের মাটি এত উর্বর, পরনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াত হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১০০টা শিল্পাঞ্চল করে দিয়েছি, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। কৃষি জমিটা যেন নষ্ট না হয়। কৃষিপণ্য বা খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা করতে পারি এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে। অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপণ্য সংরক্ষণের কথা ভাবছি। যে অঞ্চলে যে ফসলটা সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হচ্ছে, সেভাবেই সংরক্ষণাগার গড়ে তুলতে হবে। শিল্পাঞ্চলে আলাদা প্লট নিয়ে আলাদা সংরক্ষণাগার করা যাবে। এর ফান্ড আমি দেবো।

তিনি বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও স্যাংকশনের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। আমাদের অনেক কিছু বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। তবে অনেক দেশের সঙ্গে পণ্য আনার চুক্তি করেছি। পণ্যের দাম যেমন বেড়েছে, পরিবহন খরচও বেড়েছে। তবু কৃষকের ভর্তুকি আমরা দিয়ে যাচ্ছি।

সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফরের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার মাঝে একটা উদ্বেগ, ২০২৩ সালে দুর্ভিক্ষ-খাদ্যমন্দা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে যেন এটা না হয়। আমাদের খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। এই যুদ্ধ তাড়াতাড়ি বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। যুদ্ধ বন্ধ করেন, আমি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই আবেদনটাই জানিয়েছি।

জনগণকে করোনার টিকা নেওয়ার উৎসাহ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী শীত মৌসুম এলে আবার যাতে করোনার প্রাদুর্ভাব না হয়। সবাই টিকাটা নিয়ে নেবেন। শিশুদেরও আমরা টিকা দিচ্ছি। সবাইকে আবারও বলছি।

You might also like