দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী আবহের মধ্যে সংস্কারপন্থি, সামরিক-সমর্থিত রক্ষণশীল এবং জনতাবাদী— এই তিন ধারার রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতার দখল নিতে মুখোমুখি হয়েছে। ভোটের ফলাফলে কোনও দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে জোট সরকার গঠনই হতে পারে অনিবার্য বাস্তবতা। এবারের নির্বাচনে ভোটগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সংবিধান বদলের প্রশ্নে একটি গণভোটও হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, থাইল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে ভোটকেন্দ্রগুলো খুলে দেয়া হয়। বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই ভোটগ্রহণ চলবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া আগাম ভোটগ্রহণ পর্বে ইতোমধ্যে ২২ লাখের বেশি ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন।
থাইল্যান্ডে এবারের সাধারণ নির্বাচনে মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটি ৩০ লাখ এবং ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং তীব্র জাতীয়তাবাদী আবহের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যদিও ৫০টিরও বেশি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, বাস্তবে কেবল তিনটি দল— পিপলস পার্টি, ভূমজাইথাই এবং ফেউ থাই দেশজুড়ে সংগঠন ও জনপ্রিয়তার কারণে সরকার গঠনের মতো ম্যান্ডেট পাওয়ার অবস্থানে রয়েছে।
আরও পড়ুন: আজ মাঠে নামছে ১০৫১ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট
অবশ্য ৫০০ আসনের এই সংসদে কোনও দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলে জরিপগুলোতে ইঙ্গিত মিলছে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জোট সরকার গঠনের আলোচনা প্রায় নিশ্চিত। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোটেই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন।
আল জাজিরা বলছে, নাথাফং রুয়াংপানইয়াওয়ুতের নেতৃত্বে সংস্কারপন্থি পিপলস পার্টিই সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দলটির সংস্কারমূলক কর্মসূচি, বিশেষ করে সামরিক বাহিনী ও আদালতের প্রভাব কমানো এবং অর্থনৈতিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে তারা একজোট হয়ে পিপলস পার্টিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার চেষ্টা করতে পারে।
এই দলটি মূলত মুভ ফরওয়ার্ড পার্টির উত্তরসূরি। ২০২৩ সালের নির্বাচনে ওই দলটি সংসদে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সামরিক-নিয়োগপ্রাপ্ত সিনেট তাদের ক্ষমতায় যেতে বাধা দেয়। পরে রাজতন্ত্র অবমাননা সংক্রান্ত কঠোর আইন সংস্কারের আহ্বানের কারণে সাংবিধানিক আদালত দলটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
অন্যদিকে ভূমজাইথাই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল। রাজতন্ত্রপন্থি ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের সমর্থক শক্তির প্রধান রক্ষক এবং পছন্দের দল হিসেবেই তাদের দেখা হচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বর থেকে অনুতিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন শিনাওয়াত্রার মন্ত্রিসভায় ছিলেন। কম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগে পায়েতংতার্নকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। অনুতিনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের হুমকি তৈরি হলে তিনি ডিসেম্বরে সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের ডাক দেন।
অনুতিনের নির্বাচনী প্রচারের মূল বিষয় ছিল অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও জাতীয় নিরাপত্তা। প্রতিবেশী কম্বোডিয়ার সঙ্গে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর উসকে ওঠা জাতীয়তাবাদী আবেগকে তিনি রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগান।
তৃতীয় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফেউ থাই দলটি কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা-সমর্থিত রাজনৈতিক ধারার সর্বশেষ রূপ। দলটি থাই রাক থাই পার্টির জনতাবাদী রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করছে এবং এই দলটি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল এবং পরে সামরিক অভ্যুত্থানে উৎখাতের শিকার হয়।
ফেউ থাই পার্টি অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও নগদ সহায়তার মতো প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালিয়েছে। দলটি প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে থাকসিনের ভাতিজা ইয়োদচানান ওংসাওয়াতকে।
এদিকে রোববারের ভোটগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে একটি গণভোটও হচ্ছে। এতে ভোটারদের জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, ২০১৭ সালে সামরিক বাহিনী প্রণীত সংবিধান পরিবর্তন করা হবে কি না। গণতন্ত্রপন্থি গোষ্ঠীগুলো মনে করছে, নতুন সংবিধান সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের মতো অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে রক্ষণশীলদের আশঙ্কা, এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।