আগামীতে দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। দুর্নীতির মূলোৎপাটনের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘দুর্নীতির জড় আমরা কেটে দিতে চাই। আমরা দুর্নীতির পাতা আর ডাল ধরে টান দেব না, আমরা দুর্নীতির ঘাড় ধরে টান দেব ইনশাআল্লাহ।’
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টা ২০ মিনিটে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে জামায়াত আমির তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘রাঘব বোয়াল, গডফাদার, মাফিয়া—এরা থাকবে আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর ওই যারা ছিঁচকে চোর তাদেরকে আনবেন আপনি আইনের আওতায় শাস্তি দেবেন—এটা চরম অন্যায়। জড়ে মূলে হাত দিতে হবে ইনশাআল্লাহ। তাই আমরা অঙ্গীকার করেছি—আল্লাহ যদি আমাদেরকে দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন, আমরা নিজেরা চাঁদাবাজি করব না, করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না এবং কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেওয়া হবে না।’’
জনসভায় তিনি বিগত সরকারের আমলের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের চিত্র তুলে ধরে বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক, বিমা ও মেগা প্রজেক্টের নামে জনগণের টাকা লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতেই বিদেশে পাচার হয়েছে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা, যা দেশের চারটি বাজেটের সমান। তিনি বলেন, ‘লুণ্ঠন ও পাচারের সাথে যারা জড়িত, তারা জীবনেও এই টাকা ফেরত আনতে চাইবে না। আমরা কথা দিচ্ছি, এই টাকা ১৮ কোটি মানুষের টাকা। আমরা চূড়ান্ত লড়াই করব এই টাকা ফেরত আনার জন্য।’
দলের নেতাকর্মীদের ওপর বিগত দিনের নির্যাতনের কথা স্মরণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে বড় মজলুম দল। জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে দলের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। হাজার হাজার কর্মীকে হত্যা ও ৫ হাজার সহকর্মীকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। সাড়ে ১৩ বছর আমাদের অফিসগুলো বন্ধ ছিল এবং শেষমেশ দল ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি ও দলের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারী সরকার বিদায়ের পর আমরা ঘোষণা করেছি—দলের পক্ষ থেকে আমরা কারো বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধ নেব না। তবে শহীদ পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা তাদের আইনি সহায়তা দেব।’ এসময় তিনি মিথ্যা মামলা ও মামলা বাণিজ্যের বিরুদ্ধেও কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।
নারীর মর্যাদা ও যুবকদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা বেকার ভাতা দিয়ে কাউকে বেইজ্জত করতে চাই না। আমরা যুবকদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। আর নারী জাতি আমাদের মা। তাদের ইজ্জতের শতভাগ গ্যারান্টি, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই থামবে না।’
বরিশাল অঞ্চলের নদী ভাঙন সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, নদী শাসন নয়, নদী সংস্কার প্রয়োজন। নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। বাজেট লুটপাট না করে সঠিকভাবে বাঁধ নির্মাণ ও নদী সংস্কার করলে ১০ বছরে এই অঞ্চলের দৃশ্যপট পাল্টে যাবে।
জনসভায় তিনি দলীয় বিজয়ের চেয়ে জনগণের বিজয়কে প্রাধান্য দিয়ে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। আমরা এমন এক নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, সরকারি দল ও বিরোধী দলের জন্য আলাদা বিচার হবে না। রাষ্ট্রপতি থেকে সাধারণ মানুষ—অপরাধ করলে সবাই একই বিচারের আওতায় আসবে।’
সমাবেশে বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং জনগণের কাছে তাদের জন্য ভোট ও দোয়া প্রার্থনা করেন। জনসভায় স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।