লিউকেমিয়া হলো এক ধরনের ব্লাড ক্যানসার, যা রক্তের কোষ, বিশেষত শ্বেত রক্তকণিকার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটায় এবং অস্থি মজ্জা থেকে শুরু হয়। ব্লাড ক্যানসার একটি বড় শ্রেণি, যার মধ্যে লিউকেমিয়া ছাড়াও লিম্ফোমা এবং মায়োলোমা’র মতো অন্যান্য ক্যানসার অন্তর্ভুক্ত। তবে লিউকেমিয়া সবচেয়ে সাধারণ ধরনের ব্লাড ক্যানসার।
লিউকেমিয়ার মতো ভয়ংকর ও দ্রুতগতির ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি দেখা গেল যুক্তরাজ্যে। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এ প্রথমবারের মতো নতুন ধরনের এক অভিনব চিকিৎসা পেয়েছেন লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত ২৮ বছর বয়সী অস্কার মারফি। নিজের চিকিৎসা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে অস্কার বললেন, এটা একেবারে সায়েন্স ফিকশনের মতো কিন্তু অসাধারণ।
ম্যানচেস্টার রয়্যাল ইনফার্মারিতে গত ২ জানুয়ারি অস্কার এই চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়েছে ‘সিএআর-টি থেরাপি’, যাকে বলা হচ্ছে ‘লিভিং ড্রাগ’ বা জীবন্ত ওষুধ। কারণ, এই চিকিৎসায় রোগীর নিজের রোগ প্রতিরোধক কোষই ক্যানসারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে ওঠে।
কী এই সিএআর-টি থেরাপি
সিএআর-টি থেরাপিতে রোগীর শরীর থেকে টি-সেল নামের এক ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা সংগ্রহ করা হয়। এরপর ল্যাবে জেনেটিকভাবে এগুলোকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যেন তারা ক্যানসার কোষকে চিনে ফেলতে পারে। পরিবর্তিত এই কোষগুলোর গায়ে নতুন রিসেপ্টর তৈরি হয়, যা তালা-চাবির মতো ক্যানসার কোষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেগুলো ধ্বংস করে।
এই বিশেষ কোষগুলোকে বলা হয় কাইমেরিক অ্যান্টিজেন রিসেপ্টর টি-সেল, সংক্ষেপে সিএআর-টি সেল। ল্যাবে কোটি কোটি কপি বানিয়ে এগুলো আবার রোগীর শরীরে প্রবেশ করানো হয়। অস্কারের ক্ষেত্রে মাত্র তিন চা-চামচ তরলের মধ্যে ছিল ১০ কোটি সিএআর-টি থেরাপি সেল। এত অল্প পরিমাণে এত শক্তিশালী চিকিৎসা এতেই অবাক তিনি।
অস্কারের লড়াইয়ের গল্প
২০২৫ সালের মার্চে অস্কারের শরীরে ধরা পড়ে বি-সেল অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া একটি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক রক্ত ক্যানসার। কেমোথেরাপি ও ডোনার স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের পর কিছুদিন সুস্থ থাকলেও নভেম্বরে জানা যায়, ক্যানসার আবার ফিরে এসেছে। অস্কার বলেন, আমার এই এই লিউকেমিয়া এত দ্রুত ছড়ায় যে, একে থামাতে আরও দ্রুত কোনও সমাধান দরকার ছিল। সে কারণেই চিকিৎসকরা সিএআর-টি থেরাপি বেছে নেন।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এই চিকিৎসা নেয়া ৭৭ শতাংশ রোগী রেমিশনে গেছেন। এমনকি সাড়ে তিন বছর পরও অর্ধেক রোগীর শরীরে ক্যানসারের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। গড়ে রোগীরা প্রায় ১৫.৬ মাস অতিরিক্ত জীবন পেয়েছেন।
চিকিৎসকদের আশার কথা
অস্কারের চিকিৎসক হেমাটোলজিস্ট ডা. এলেনি থোলোউলি জানান, সিএআর-টি থেরাপি আগের চিকিৎসাগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম। তিনি বলেন, এই ধরনের লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক রোগীরা সাধারণত ছয় থেকে আট মাসের বেশি বাঁচেন না। কিন্তু এই থেরাপির মাধ্যমে আমরা তাদের বহু বছর এমনকি স্থায়ীভাবে সুস্থ হওয়ার সুযোগ দিতে পারছি।
চিকিৎসা নেয়ার মাঝেই মধ্যেই অস্কার ও তার সঙ্গী লরেন গত মাসে হাসপাতালেই বিয়ে করেন। সামনে আবার অক্টোবর মাসে আরেকটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা আছে। অস্কার বলেন, আমি স্বাভাবিক একটা জীবন চাই। এই চিকিৎসাই সেই স্বপ্নের পথে আমার দরজা খুলে দিয়েছে।
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে নতুন অধ্যায়
এতদিন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস-এ সিএআর-টি থেরাপি সীমিত কিছু লিউকেমিয়া ও লিম্ফোমার ক্ষেত্রে ব্যবহার হলেও, প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের জন্য এটি এবারই প্রথম অনুমোদন পেল। চিকিৎসার প্রতিটি ইনফিউশনের মূল্য প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার পাউন্ড হলেও ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বিশেষ ছাড়ে এটি সরবরাহ করবে। প্রতি বছর আনুমানিক ৫০ জন রোগী এই চিকিৎসার সুবিধা পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এটি হয়তো স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের বিকল্প হিসেবে প্রথম সারির চিকিৎসা হয়ে উঠবে।
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ক্যানসার বিভাগের জাতীয় পরিচালক অধ্যাপক পিটার জনসন বলেন, এটি ব্লাড ক্যানসারের রোগীদের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। যুক্তরাজ্যের গবেষণায় তৈরি এই চিকিৎসা বহু মানুষের জীবন বদলে দেবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতি প্রমাণ করে কখনো কখনো সায়েন্স ফিকশনও বাস্তব হয়ে ওঠে, আর সেই বাস্তবই কাউকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়।