চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে যে আমূল পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দেশব্যাপী উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে ছিল ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরাই অধিকাংশ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে আছেন। বেসরকারি হিসেবে ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ১৯৪টিতে, জামায়াতে ইসলামী ৫৬টিতে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৪টিতে এবং অন্যান্য প্রার্থীরা ৭টিতে বিজয়ী হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ বৃহস্পতিবার দুপুরে জানান, বেলা ১২টা পর্যন্ত ৩২ হাজার ৭৮৯টি কেন্দ্রে ৩২.৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। পরে দুপুর ২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের হার দাঁড়ায় ৪৭.৯১ শতাংশ।
রাত ৯টার দিকে নির্বাচন সচিবালয় জানায়, কয়েকটি কেন্দ্র বাদে গড়ে ৬০.৬৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ভোটের আগের রাতে নানা আশঙ্কা ও উদ্বেগের কথা শোনা গেলেও ভোটের দিন বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই দেশের ২৯৯টি আসনের ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। কোথাও কোথাও হাতাহাতি বা উত্তেজনার বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি ছিল শান্তিপূর্ণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান শেষে বলেন, এটা আমার জীবনে মহা আনন্দের দিন।
বাংলাদেশের সবার মনে এটা মহা আনন্দের দিন, মুক্তির দিন। আমাদের দুঃস্বপ্নের অবসান, নতুন স্বপ্নের শুরু।
গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে সার্বিক সহযোগিতা করায় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, ভোটারসহ দেশবাসীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। বাংলাদেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নতি কামনা করে শুক্রবার বাদ জুমা দেশের সব মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে সুবিধাজনক সময়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। গত রাতে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
এর আগে সকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন হাই স্কুলে ভোট দিতে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আগে তো আপনারা ভোটকেন্দ্রে অনেক কুকুর (ভোটারশূন্য অর্থে) দেখিয়েছেন টেলিভিশনে, আজ কেন্দ্রের ধারেকাছে তো কুকুর দেখছি না। এখন সব মানুষ আর মানুষ।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সকালে রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেন, এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন চলছে। আমি সম্মানিত ভোটারদের অনুরোধ করব, আপনারা নির্ভয়ে আপনাদের বাসা থেকে বের হয়ে পোলিং স্টেশনে যাবেন এবং ভোট দেবেন। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। একটা সুষ্ঠু নির্বাচন, আজ সেই নির্বাচন হতে যাচ্ছে।