সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে গড়ে ওঠা নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রতি তুরস্ককে যুক্ত করে নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা করছে, যা মূলত ন্যাটোর ‘সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতি’ অনুসারে গড়ে উঠবে। এর অর্থ হলো, কোনো এক সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনকে অন্য সব সদস্যের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।
এই বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা ব্লুমবার্গ উল্লেখ করেছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তির কাঠামো ন্যাটোর সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। আর এটি শুধু সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বর্তমানে তুরস্ককে যুক্ত করার মাধ্যমে এর ভৌগোলিক ও কৌশলগত পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।
সৌদি আরব অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে, পাকিস্তান পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ক্ষমতা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জনবল যোগ করবে, আর তুরস্ক সরবরাহ করবে সামরিক দক্ষতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা। আঙ্কারার থিংক ট্যাংক ‘টেপাভে’র কৌশলবিদ নিহাত আলি ওজচান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের স্বার্থ ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন আঞ্চলিক দেশগুলো নতুন নিরাপত্তা চুক্তির দিকে এগোচ্ছে।
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের কৌশলগত স্বার্থ দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু অংশে ক্রমেই সাদৃশ্যপূর্ণ হচ্ছে। এর ফলে এই ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা জোট গঠন স্বাভাবিক ও যৌক্তিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই তিন দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ইঙ্গিত মিলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত প্রথম যৌথ নৌবাহিনী বৈঠকেও এ সংযোগ দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।
তুরস্কের বিশেষ গুরুত্বও রয়েছে এই জোটে। কারণ, তুরস্ক শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর সদস্য এবং ন্যাটোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী হিসেবে পরিচিত।
সৌদি আরব ও তুরস্ক উভয়েই ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, যদিও তারা সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেয়। সিরিয়ার স্থিতিশীলতা ও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতেও তারা একমত।
অন্যদিকে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বহুদিনের। তুরস্ক ইতোমধ্যে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধজাহাজ তৈরি করেছে, এফ-১৬ বিমান বহর আধুনিক করেছে এবং উভয় দেশ ড্রোন প্রযুক্তি ভাগাভাগি করছে। এছাড়া তুরস্ক তাদের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ প্রকল্পে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা আলোচনা এমন এক সময় এসেছে, যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে চারদিন ব্যাপী উত্তেজনার পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যেখানে তুরস্ক পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বলে জানা গেছে।
এই নতুন ‘ইসলামিক ন্যাটো’ জোট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রাখে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য ও জোট নির্মাণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।