ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করার একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) বাতিল হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সমর্থিত এই প্রস্তাবটি পাস হলে যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাত থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হতো। কিন্তু ভোটাভুটিতে এটি ২১২–২১৯ ভোটে পরাজিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়।
এতে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই সংঘাতের লক্ষ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন রিপাবলিকান প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি এবং ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রো খানা। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক অভিযান অনুমোদন না দেওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাত থেকে সরে আসতে হতো।
ভোটটি মূলত দলীয় লাইনে বিভক্ত ছিল। তবে দুইজন রিপাবলিকান সদস্য তাদের দলের অবস্থানের বিপক্ষে গিয়ে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন, আর চারজন ডেমোক্র্যাট সদস্য এর বিরুদ্ধে ভোট দেন।
প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি ব্যর্থ হওয়ার আগে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে রিপাবলিকানরা একই ধরনের আরেকটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
তাদের নেতারা মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌ অভিযান শুরু করার ক্ষমতা ট্রাম্পের ছিল। এই অভিযানের জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং ইরানে নিহত হয়েছেন ১,২৩১ জন।
প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসন বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করা খুবই খারাপ ও বিপজ্জনক ধারণা।’
তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের শত্রুদের শক্তিশালী করবে, আমাদের বাহিনীর সক্ষমতা কমিয়ে দেবে এবং সবাইকে নিরাপদ রাখতে যে গুরুত্বপূর্ণ মিশন চলছে তা শেষ করার ক্ষমতা মার্কিন সামরিক বাহিনী ও প্রধান সেনাপতির কাছ থেকে কেড়ে নেবে।
ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযান শুরু হয় কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ সমাধান করা। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কংগ্রেসের কয়েকজন শীর্ষ আইনপ্রণেতাকে আগাম জানালেও, আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক অভিযান অনুমোদনের জন্য আইনপ্রণেতাদের ভোট চাননি।
কেন ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাল, এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাখ্যা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ইসরায়েল ইরানে হামলার পরিকল্পনা করেছিল এবং এতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনাগুলোর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি ছিল, এই কারণেই ওয়াশিংটন পদক্ষেপ নেয়।
তবে সংঘাতের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েও প্রশাসন স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। ফলে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, পরিষ্কার কোনো লক্ষ্য ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র একটি অবৈধ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেন, ‘কেন আমরা আমেরিকান সেনাদের বিপদের মুখে ফেলছি এবং একটি বিদেশি যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছি, এর কোনো স্পষ্ট যুক্তি নেই। অথচ দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকট চলছে, যা ট্রাম্প প্রথম দিনেই সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু রিপাবলিকান নীতির কারণে তা আরও খারাপ হয়েছে।’
যেসব রিপাবলিকান এই প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন, তারা বলেন সংবিধান অনুযায়ী সামরিক সংঘাতে জড়ানোর আগে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে।
থমাস ম্যাসি বলেন, ‘১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশনে স্পষ্ট বলা আছে, তিনটি পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীকে যুদ্ধে পাঠাতে পারেন: যুদ্ধ ঘোষণা, নির্দিষ্ট আইনগত অনুমোদন অথবা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার কারণে সৃষ্ট জাতীয় জরুরি অবস্থা। আজ এই তিনটির কোনোটিই নেই।’
ডানপন্থি আইনপ্রণেতা ওয়ারেন ডেভিডসনও প্রস্তাবটির পক্ষে ছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানে হামলা চালিয়ে ট্রাম্প তার ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভুল বোঝার সুযোগ নেই, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু। আমাদের সামরিক বাহিনী যখন তাদের বিরুদ্ধে লড়ছে, তা ন্যায্যভাবেই করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা এখনো সংবিধান অনুযায়ী হচ্ছে না।’
১৯৭৩ সালে কংগ্রেস এই আইনটি পাস করেছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সৈন্য মোতায়েন করার কারণে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশনই যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো সংঘাত থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করতে পারেনি।
তবে এই ধরনের প্রস্তাব আইনপ্রণেতাদের সুযোগ দেয় কোনো বিদেশি সংঘাতে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করার।
ইসরায়েলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডার ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা জ্যারেড মস্কোভিটজ কংগ্রেসের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘কংগ্রেস প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার পথে। আমরা নিজেরাই নিজেদের এই অবস্থায় এনেছি। আমরা যদি কোনো প্রাণচিহ্ন না দেখাই, তাহলে আমাদের বাঁচাতে কেউ আসবে না।’

