মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়তে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবশ্যই ইরানের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তার মতে, চলমান সংকট কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরান মিত্রদেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেও যুক্তরাষ্ট্রকে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেন, সংকট প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো জরুরি। এ বিষয়ে তার ‘দৃঢ় মত’ হলো, দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার পথ খুঁজতে হবে।
স্টারমারের এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ এর আগে ইরানে হামলার জন্য চাগোস দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়া ব্যবহারের অনুমতি দিতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদন অস্বীকার করেননি। ওই প্রকিবেদনে বলা হয়েছে তিনি স্টারমারকে ‘লুজার’ বা অভাগা ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আবারও বলেন, স্টারমার ‘উইনস্টন চার্চিল নন’।
ইরান সংকট মোকাবিলায় স্টারমারের ভূমিকা নিয়েও যুক্তরাজ্যে চাপ বাড়ছে। সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি মিত্রদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলোর পক্ষে যথেষ্ট শক্ত অবস্থান নেননি।
গত রোববার সাইপ্রাসে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের আক্রোতিরি ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এরপরও টাইপ–৪৫ ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস ড্রাগন মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিতে স্টারমারের ৭২ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। জাহাজটিতে বর্তমানে ওয়েল্ডিং কাজ চলছে এবং এটি দুই সপ্তাহের আগে সেখানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই। এ সময়ের মধ্যে ফ্রান্স ও স্পেন ইতোমধ্যে নিজেদের যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবারও হামলা অব্যাহত রাখে ইরান। আজারবাইজানের একটি বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং এতে চারজন বেসামরিক নাগরিক আহত হন। এছাড়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ইরানের বিভিন্ন শহরে বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইরান-সমর্থিত সংগঠন হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টারেও হামলা চালিয়েছে।
এমন অবস্থায় ডাউনিং স্ট্রিটে এক সংবাদ সম্মেলনে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে স্টারমার ঘোষণা দেন, কাতারের প্রতিরক্ষা জোরদারে যুক্তরাজ্য চারটি অতিরিক্ত টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে যে অবস্থান নিয়ে রেখেছে সেটা হলো— এই অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হচ্ছে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করা, যেখানে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই কারণেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম দফার হামলায় যোগ দেয়নি যুক্তরাজ্য। সিদ্ধান্তটি বুঝেশুনে ও সচেতনভাবেই নেয়া হয়েছে, এটি জাতীয় স্বার্থে নেয়া সিদ্ধান্ত এবং আমি এ অবস্থানেই আছি।’ এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে বলেছেন, এখন ‘খুব দেরি হয়ে গেছে’।
তবে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক মন্তব্য করেছেন, স্টারমারের এই বক্তব্য তার দৃঢ়তার অভাবই প্রকাশ করে। তিনি দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘এতে বোঝা যায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী কেমন মানুষ। কিয়ার স্টারমার মনে করেন ‘ভালো ব্যবহার’ই সামরিক কৌশল, আর ট্রাম্প যদি ইরানের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলেন তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরান এখন আমাদের সেনা, সামরিক ঘাঁটি ও মিত্রদেশগুলোর দিকে হামলা চালাচ্ছে। তারা যুক্তরাজ্যের ভেতরেও বহু হামলা চালিয়েছে এবং অবৈধভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। স্টারমারের আইনজীবীর মতো আচরণ বন্ধ করে নেতার মতো আচরণ করা উচিত।’

