বিশ্ব কবিতা দিবস উপলক্ষে কথা হয় দেশের বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী সামিউল ইসলাম পোলাকের সঙ্গে। ইউনেস্কো ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপ্রাপ্ত এই গুণী শিল্পী কথা বলেছেন কবিতার নান্দনিকতা এবং বর্তমান সময়ে আবৃত্তিশিল্পের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে।
বিশ্ব কবিতা দিবস আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?
কবিতা আমাদের চেতনার গভীরে আলো জ্বেলে। এই দিনটি সেই আলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন। একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে আমি মনে করি, আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়—কবিতাকে মানুষের হৃদয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।
আপনি কি মনে করেন আপনি বর্তমান সময়ে আবৃত্তির শীর্ষস্থানে আছেন?
‘শীর্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি আমার কাজের মাধ্যমে এমন একটি মানদণ্ড তৈরি করেছি, যা আজ অনেকের জন্য অনুসরণীয়। প্রায় এক দশক ধরে আমি দেশে-বিদেশে আবৃত্তি করছি। মহান আল্লাহর কৃপায় আমি বাংলাদেশের জাতীয় নাট্যশালা থেকে শুরু রাষ্ট্রপতি ভবন বঙ্গভবনে একক নিবেদন করেছি। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসরকারের আমন্ত্রণে রবীন্দ্র সদন একক নিবেদনের পাশাপাশি দিল্লীর ইন্ডিয়ান হ্যাবিটেট সেন্টারে আবৃত্তি করেছি।। এছাড়া বিভিন্ন দূতাবাস ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আমন্ত্রণে যেমন আমেরিকান সেন্টার, ভারতীয় হাই কমিশন, আলিয়ান্স ফ্রঁসেজ, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, গ্যোটে ইনস্টিটিউটে কবিতা নিবেদন করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতীতেও আমি একক আবৃত্তির অনুষ্ঠান হয়েছে। ইউনেস্কো আমার কাব্য পরিবেশনা বিশ্বকবিতা এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রকাশ করেছে। সারেগামা ও হিন্দুস্থান রেকর্ডস আমার একক সংকলন প্রকাশ করেছে। এই অর্জনগুলো আমার একার নয়, কবিতার।
আপনি কি বলবেন, আবৃত্তিতে আপনার পুরষ্কার বা স্বীকৃতি কেমন?
শেষ দুই দশক ধরে আবৃত্তিকে সত্যিকারের কোনো স্বীকৃতি খুব একটা দেওয়া হয়নি বাংলাদেশের মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্রীয় পদক ছাড়া। আলহামদুলিল্লাহ আজ সংগীত , নৃত্য, চলচ্চিত্রের পাশাপাশি আমাকে বহু জনপ্রিয় পুরস্কার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, স্বীকৃতিস্বরূপ পুরুষ্কার প্রদান করা হয়েছে। ভারতে টেলিসিনে অ্যাওয়ার্ডস, বাংলাদেশে্র বাইফা, বাংলাদেশ অ্যাচিভার্স অ্যাওয়ার্ডস সহ নানান জায়গায় আমার আবৃত্তিকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। এটা শুধু আমার জন্য নয়, বরং আবৃত্তিকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার পথও খুলে দিয়েছে।
আজকের দ্রুতগতির কনটেন্ট যুগে আপনি কীভাবে কবিতাকে প্রাসঙ্গিক রাখেন?
আমি প্রাসঙ্গিক হওয়ার চেষ্টা করি না, আমি অপরিহার্য হওয়ার চেষ্টা করি। সবকিছু দ্রুতগতির, তাই গভীরতা কমে। আমি সেই গভীরতাটাই ধরে রাখি। মানুষ হয়তো স্ক্রল করে, কিন্তু একসময় থামে। আমি সেই থামার জায়গা তৈরি করি। সেখানে কবিতা তার শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে।
আপনি বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন। এর কারণ কী?
রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আমি নিজেকে খুঁজে পাই। তার দর্শন, চিন্তা, আচরণে আমি সহজভাবে নিজেকে পাই।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলা কবিতা পরিবেশন করা গর্বের। ভাষা সবসময় বোঝা যায় না, কিন্তু আবেগের ভাষা সবাই বোঝে। সঠিক আবেগ ও উপস্থাপনা থাকলে শ্রোতারা তা অনুভব করে।
আগামীতে আপনার কী কাজ রয়েছে?
খুব শীঘ্রই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যপাঠ সংকলন প্রকাশ হবে। এখন প্রস্তুতি চলছে বাংলা নববর্ষ এবং রবীন্দ্রজয়ন্তীর জন্য। বাংলাদেশের আবৃত্তি শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে দৃশ্যমান করার ক্ষেত্রে সামিউল ইসলাম পোলাকের অবদান অনন্য। তার কণ্ঠে কবিতা শুধু উচ্চারিত হয় না, তা একটি অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। বিশ্ব কবিতা দিবসে তার অবস্থান মনে করিয়ে দেয়, আবৃত্তি হতে পারে একটি জাতির গর্বের প্রকাশ।

