ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নতুন করে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করতেই রিয়াদ এ পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সৌদি আরবের বিমান হামলা ও তত্ত্বাবধানে ইয়েমেনি বাহিনীর সমন্বয়ে এই অভিযান শুরু হতে পারে।
প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িত পারস্য উপসাগরীয় ও ইয়েমেনি কর্মকর্তা এবং পশ্চিমা কূটনীতিকসহ ছয়টি পৃথক সূত্র নিশ্চিত করেছে, অভিযানের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে এটি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কিংবা নভেম্বরের শুরুতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই শুরু হতে পারে।
কূটনৈতিক ও সামরিক সূত্রে জানা গেছে, রিয়াদ বর্তমানে দুটি সম্ভাব্য কৌশল বিবেচনা করছে: কেবল বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও তার চারপাশের উপকূলীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সুনির্দিষ্ট হামলা এবং একই সঙ্গে আল-বায়দা, মা’রিব, তাইজ এবং আল-জাউফ প্রদেশে সমন্বিত আক্রমণ পরিচালনার কথা ভাবা হচ্ছে।
অভিযানের পরিধির ওপর নির্ভর করে ইয়েমেনের প্রায় ১ লাখেরও বেশি সেনাকে এই লড়াইয়ে প্রস্তুত করা হতে পারে।
গত মাসে হুতি বিদ্রোহীরা দ্রুত অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, এই কৌশলগত পথটি হুতিদের দখলে থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে নতুন করে কোনো শান্তি আলোচনায় বসতে নারাজ সৌদি আরব। হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে সরাসরি অংশ না নিলেও সৌদি আরবকে সামরিক উপদেষ্টা ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণের জন্য উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সরাসরি বিমান হামলার জন্য সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
অন্যদিকে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম এবং সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। পাকিস্তান সৌদি সীমান্তে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি এডেনে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামানের গোলা, ড্রোন ও ড্রোন-বিরোধী প্রযুক্তি ভর্তি চারটি কার্গো বিমান পাঠিয়েছে ইসলামাবাদ।
অপরদিকে সৌদি আরবের পূর্বে কেনা তুর্কি ড্রোনগুলো ইয়েমেনের আকাশে নজরদারিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফ্রান্সও লোহিত সাগরের বন্দর নগরী ইয়ানবু সুরক্ষায় ডিফেনসিভ সিস্টেম এবং সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে গতকাল শুক্রবার ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার জানান, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা মোকাবিলায় আগামী সপ্তাহে রিয়াদে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’-এর কৌশলগত রাজনৈতিক সংস্থা (এসপিডিসি)-র একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের সমন্বয়ে গঠিত এই ত্রিদেশীয় জোটের এই বৈঠকে সেনা প্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা উপস্থিত থাকবেন।
ইশাক দার আরও জানান, তিনি এ বিষয়ে ইরানের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তবে ইরান হুতিদের ওপর তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ বা সহায়তার কথা অস্বীকার করে সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক আলোচনার পরামর্শ দিয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ অভিযান রিয়াদের জন্য সহজ হবে না। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি মন্তব্য করেন, ‘সৌদি আরবের মূল লক্ষ্য হবে ২০১৫ সালের মতো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের বদলে উপকূলীয় এলাকা থেকে হুতিদের হটিয়ে স্বাভাবিক নৌচলাচল ফিরিয়ে আনা।’
তবে ইয়েমেন বিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশার মতে, হুতি-বিরোধী ইয়েমেনি গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন একটি বড় বাধা। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং সৌদি সমর্থিত বাহিনীর মধ্যকার সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব মাঠপর্যায়ের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা সংঘাত শুরু হওয়ার পর এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের এই নতুন সামরিক উদ্যোগ সমগ্র অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে।

