গাজা, লেবানন ও ইরান— মধ্যপ্রাচ্যের এই তিন ফ্রন্টে সামরিক অভিযানের মাত্রা কমিয়ে সংঘাতের অবসান চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও গাজা-লেবাননে সামরিক অভিযান নিয়ে ইসরায়েল এখনই পিছু হটতে রাজি নয়। ফলে যুদ্ধের তিনটি ফ্রন্ট বন্ধ করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মতপার্থক্য আরও গভীর হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১৩।
বার্তাসংস্থা আনাদোলু বলছে, গাজা, লেবানন ও ইরানে চলমান সামরিক অভিযান কমিয়ে সংঘাতের তিনটি ফ্রন্টই বন্ধ করার জন্য ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই আরও গভীর হচ্ছে।
রোববার (৯ আগস্ট) প্রকাশিত প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে চ্যানেল ১৩ জানায়, গত শনিবার ইসরায়েল সফরের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইসরায়েলকে এই বার্তা দেন যে, ওয়াশিংটন চায় ‘তিনটি ফ্রন্টে চলমান সংঘাত বন্ধের দিকে অগ্রগতি’ হোক।
তবে আঞ্চলিক বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান কতটা কমানো হবে, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ইরান পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে গেলে বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করলে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার স্বাধীনতা ধরে রাখতে চায় ইসরায়েল।
এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তা অঞ্চলের ভেতরে থাকা অবস্থানগুলো থেকে ইসরায়েলি সেনা আরও সরিয়ে নেয়ার জন্য ওয়াশিংটন চাপ দিচ্ছে বলে জানিয়েছে চ্যানেল ১৩। অন্যদিকে গাজায় একটি বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনের জন্যও চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে ওই বাহিনীতে মরক্কো ও উগান্ডার কয়েক শ সেনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সম্প্রচারমাধ্যমটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড বন্ধ এবং সামরিক অভিযান কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে দাবি তুলছে, গত কয়েক দিনে ইসরায়েলের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও সে বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে আপত্তি জানিয়েছেন।
তবে চ্যানেল ১৩ জানিয়েছে, বর্তমানে যে প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে, সেখানে এসব দাবি সরাসরি উল্লেখ নেই। সম্প্রচারমাধ্যমটির উদ্ধৃত এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি ওয়াশিংটনের বার্তা হলো— ‘তিনটি ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’
এদিকে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, আপাতত ইরানের বিষয়ে কিছুটা সংযত অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা বিষয়টি এখন কম গুরুত্ব দিয়ে দেখছি’। তিনি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ‘আংশিকভাবে আলোচনা করছে’ এবং দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা শুধু ইরানকে তাদের ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং অর্থের ঘাটতির বিষয়টি নিয়ে দেখছি’। তার এই বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ওয়াশিংটন আপাতত নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু না করে ইরানের ওপর বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপের ওপর নির্ভর করতে চাইছে।
প্রসঙ্গত, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সমন্বিতভাবে ইরানের সামরিক, পরমাণু ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা শুরু করে। এর জবাবে তেহরানও পুরো অঞ্চলে ইসরায়েলি ও মার্কিন বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
এরপর ১৮ জুন পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এর মাধ্যমে সরাসরি সামরিক সংঘাত বন্ধ হয় এবং চূড়ান্ত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা শুরু হয়। তবে পরে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে মতবিরোধের কারণে সেই আলোচনা থমকে যায়।

