যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক চাপ এবং জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের দাবির মধ্যে সংস্থাটির পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের লড়াই জমে উঠেছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে এখন আটজন প্রার্থী রয়েছেন।
পাঁচ নারী ও তিন পুরুষের এই প্রতিযোগিতায় লাতিন আমেরিকার প্রার্থীদের প্রাধান্য রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইকুয়েডরের কূটনীতিক ইভোনে এ-বাকি প্রার্থী হিসেবে যুক্ত হওয়ায় প্রতিযোগিতায় প্রার্থীর সংখ্যা আটে দাঁড়িয়েছে।
গুতেরেসের দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি সালের ৩১ ডিসেম্বর। এরপর নতুন মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার কথা।
বর্তমান প্রার্থীরা হলেন-কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি, চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাচেলেত, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা, গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট, ইকুয়েডরের ইভোনে এ-বাকি, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল এবং উগান্ডার ওলার ওতুন্নু।
প্রথম ভোটে এগিয়ে গ্রিনস্প্যান
প্রার্থীদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইউএনট্রেড) প্রধান গ্রিনস্প্যান এর আগে কোস্টারিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
জুলাইয়ের শেষ দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের প্রথম অনানুষ্ঠানিক ‘স্ট্র পোল’-এ তিনি সবচেয়ে বেশি সমর্থন পান। তার পরেই ছিলেন গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট এবং আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি। তবে কোনো প্রার্থীই এখনো চূড়ান্তভাবে এগিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থান তৈরি করতে পারেননি।
গ্রিনস্প্যানের কূটনৈতিক পরিচিতি আরও বাড়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়। কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানি এবং রাশিয়ার খাদ্য ও সার রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে জাতিসংঘের উদ্যোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
গ্রসির পরমাণু কূটনীতি
আর্জেন্টিনার কূটনীতিক রাফায়েল গ্রসি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার ভূমিকা তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে পরিচিত করেছে।
তার বড় শক্তি হলো-আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, পরমাণু ঝুঁকি এবং সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা। প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটেও তিনি শীর্ষ তিনে ছিলেন।
বাচেলেতের অভিজ্ঞতা
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাচেলেত জাতিসংঘের শীর্ষ পদে অন্যতম পরিচিত মুখ। তিনি দুই মেয়াদে চিলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মানবাধিকার বিষয়ে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যেমন শক্তি, তেমনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তার অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। বিশেষ করে চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বেইজিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়।
এসপিনোসার সংস্কারের ডাক
ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার পক্ষে।
বিশ্বের সংঘাত ও সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও সক্রিয় করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তার প্রস্তাবের মধ্যে সংঘাতের সম্ভাব্য লক্ষণ আগেভাগে শনাক্ত করার সক্ষমতা জোরদারের বিষয়টিও রয়েছে।
গায়ানার রড্রিগেস-বির্কেট
গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে দেশটির রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন।
জাতিসংঘের শান্তি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়ন ও মানবাধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তার প্রচারণার অন্যতম বিষয় হলো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা।
নতুন প্রার্থী ইভোনে এ-বাকি
ইভোনে এ-বাকি প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে নতুন মুখ। ১৭ আগস্ট টোঙ্গার মনোনয়নে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দৌড়ে যুক্ত হন। ফলে ইকুয়েডর থেকে এখন দুজন প্রার্থী রয়েছেন।
এ-বাকি ইকুয়েডরের সাবেক মন্ত্রী এবং ফ্রান্স, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজের প্রার্থিতায় তিনি জাতিসংঘকে যুদ্ধ প্রতিরোধে আরও সক্রিয় এবং ফলাফলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে এ-বাকির। লেবাননে গৃহযুদ্ধের সময় তিনি সেখানে ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে সংঘাত শুরুর আগেই তা প্রতিরোধে জাতিসংঘের সক্রিয় ভূমিকার কথা বলেছেন তিনি।
আফ্রিকার প্রার্থী ম্যাকি সাল
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল আট প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র আফ্রিকান প্রার্থী। তিনি শান্তি ও উন্নয়নকে পরস্পর সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে দেখেন।
তবে তার রাজনৈতিক অতীত নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সেনেগালে তার শাসনামলে রাজনৈতিক বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের কঠোর অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার প্রার্থিতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
ওতুন্নুর জাতিসংঘ অভিজ্ঞতা
উগান্ডার কূটনীতিক ওলার ওতুন্নুর জাতিসংঘে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাবেক মহাসচিব কফি আনানের সময়ে তিনি শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল ও বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে ৭৫ বছর বয়সী ওতুন্নু জাতিসংঘের সংস্কার ও নৈতিক নেতৃত্বের ওপর জোর দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক এক সংলাপে তিনি সতর্ক করেছেন, প্রতিষ্ঠানটি যদি আগের মতোই কাজ করতে থাকে, তাহলে তার ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পরিষদ?
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করবে। এরপর সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেবে।
প্রার্থীকে নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত নয়টি ভোট পেতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স-এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কোনো একটি দেশ ভেটো দিলে প্রার্থীর পথ আটকে যেতে পারে।
এই কারণেই প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে কে কত ভোট পেলেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে কোন প্রার্থী বড় শক্তিগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেন।
দ্বিতীয় ভোটে কী হতে পারে?
প্রথম ভোটে গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও প্রতিযোগিতা এখনো উন্মুক্ত। ২১ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদে দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক ভোট হওয়ার কথা ছিল। নতুন প্রার্থী এ-বাকি প্রথম ভোটে ছিলেন না; ফলে দ্বিতীয় দফার ভোটে তার অবস্থান নিয়ে আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
কূটনীতিকদের ধারণা, একাধিক দফা ভোট হতে পারে এবং সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবর পর্যন্ত প্রক্রিয়া গড়াতে পারে। কোনো প্রার্থীকে নিয়ে ঐকমত্য তৈরি না হলে সময় আরও বাড়তে পারে।
প্রথম নারী মহাসচিবের সম্ভাবনা
এবারের দৌড়ের আরেকটি বিশেষ দিক হলো নারী প্রার্থীদের উপস্থিতি। আটজনের মধ্যে পাঁচজন নারী। জাতিসংঘের ইতিহাসে এখনো কোনো নারী মহাসচিব হননি।
এবার সেই ইতিহাস বদলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে নারী প্রার্থী হওয়াই যথেষ্ট নয়; তাকে একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়োজনীয় সমর্থন এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্যের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত কে?
এই মুহূর্তে রেবেকা গ্রিনস্প্যানকে প্রাথমিকভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী বলা যায়। তবে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটে প্রাথমিক অবস্থান দ্রুত বদলে যেতে পারে। গ্রসির আন্তর্জাতিক পরিচিতি, রড্রিগেস-বির্কেটের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা, বাচেলেতের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রার্থী এ-বাকির সম্ভাব্য সমর্থন-সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতাটি এখনো উন্মুক্ত।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, পরবর্তী মহাসচিবকে এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে হবে যখন জাতিসংঘ নিজেই অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন ও সংস্কারের চাপের মুখে। ফলে নতুন মহাসচিব শুধু একজন প্রশাসক নন-তাকে একই সঙ্গে বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রেখে শান্তি, মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে কার্যকর নেতৃত্ব দিতে হবে।
গুতেরেসের উত্তরসূরি শেষ পর্যন্ত কে হন, সেটি তাই শুধু জাতিসংঘের নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা হবে না; পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বহুপাক্ষিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও অনেকটা নির্ধারণ করবে।

