ভয়াবহ ভোটেকোশি-ত্রিশূলী বন্যায় নিহতদের স্মরণে সোমবার জাতীয় শোক পালন করছে নেপাল। সর্বশেষ পুলিশি হিসাবে দুর্যোগে ১ হাজার ৩৪২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আর এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৯৯২ জন।
তবে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে দেশটির বিভিন্ন সরকারি সংস্থার হিসাবে এখনো পার্থক্য রয়েছে। গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ দুর্যোগের ১৩তম দিনে এই জাতীয় শোক পালন করা হচ্ছে।
নেপাল সরকারের ৩ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সোমবার দেশটির সরকারি দপ্তর এবং বিদেশে নেপালি কূটনৈতিক মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে এখনো তালিকা সমন্বয়ের কাজ চলছে।
নেপাল পুলিশ সোমবার ৩ হাজার ৯৯২ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববারের হালনাগাদ তথ্যে প্রায় ৫ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ বলে জানিয়েছিল।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি শনাক্ত, একই ব্যক্তির নামে একাধিক নিখোঁজ তালিকা বাদ দেওয়া এবং নতুন তথ্য যুক্ত হওয়ার কারণে সংখ্যা পরিবর্তিত হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
উদ্ধার অভিযান এখন সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গে। নেপালের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ উদ্ধার দল আপার ত্রিশূলী-১, আপার ত্রিশূলী-৩এ, আপার ত্রিশূলী-৩বি, চিলিমে, রাসুয়াগাধি ও লাংটাংসহ বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়ানো হয়েছে। মালয়েশিয়ার ১১ সদস্যের বিশেষ দুর্যোগ উদ্ধারকারী দল নয়টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন নিয়ে নেপালে পৌঁছেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া ড্রোন, উদ্ধার সরঞ্জাম ও ভারী যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে এখনো প্রায় ৯০০ কর্মী নিখোঁজ বা আটকা থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপে ভরে যাওয়া দীর্ঘ সুড়ঙ্গগুলোতে প্রবেশ করাই উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার মধ্যেও একের পর এক জীবিত উদ্ধারের ঘটনা আশার সঞ্চার করেছে। চীনা নাগরিক লু হাইতাওকে আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ২২৫ মিটার ভেতরের একটি সুড়ঙ্গ থেকে ১০ দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাকে উদ্ধারের সময় শরীরে দৃশ্যমান বড় কোনো আঘাত ছিল না, তবে সামান্য হাইপোথার্মিয়ার লক্ষণ ছিল।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রাসুয়ায় এখনো হাজারো মানুষের খোঁজ নেই। জেলা প্রশাসনের রোববারের হিসাবে সেখানে ৩ হাজার ৭১ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তাদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা, সরকারি কর্মকর্তা, নিরাপত্তাকর্মী ও বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন।
উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি এখন মানবিক সংকটও বড় হয়ে উঠছে। রাসুয়ার আমাছোদিংমো গ্রামীণ পৌরসভা সড়ক, ঝুলন্ত সেতু ও অন্যান্য যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক এলাকায় চাল, ডাল, লবণ ও রান্নার তেল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এবং কিছু জনপদে পৌঁছানোর একমাত্র কার্যকর উপায় এখন হেলিকপ্টার।
দুর্যোগে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও ব্যাপক। নেপাল সরকারের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৭ হাজার ৫৭০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাবে পড়েছেন প্রায় ৩২ হাজার ৯৩৩ মানুষ। এ ছাড়া ৫৫ কিলোমিটার সড়ক, ৩৭টি যান চলাচলের উপযোগী সেতু ও ৬৮টি ঝুলন্ত সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জ্বালানি খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। মোট ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও দুটি সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৭৮৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রভাবিত হয়েছে বলে সরকারের প্রাথমিক মূল্যায়নে জানানো হয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, বরফ ও শিলার বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর প্রবল পানি, কাদা ও ধ্বংসস্তূপ নদী উপত্যকা দিয়ে নিচে নেমে আসে। এতে ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা বিধ্বস্ত হয়। পুরো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে এখন বিস্তারিত দুর্যোগ-পরবর্তী মূল্যায়ন চালাচ্ছে নেপাল সরকার।

