একজন রোগী একটি হাসপাতাল ছেড়ে অন্য হাসপাতালে গেলেন—এর কারণ কী?
এ বিষয়ে এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামের হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন বলেন, আমরা অনেক সময় ধরে নিই, হয়তো তিনি অন্য কোথাও ভালো চিকিৎসক পেয়েছেন, কম খরচের সুযোগ পেয়েছেন কিংবা কোনো পরিচিতজন অন্য হাসপাতালের পরামর্শ দিয়েছেন। এসব কারণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করতে গিয়ে আমার কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—রোগী সবসময় শুধু চিকিৎসার কারণে হাসপাতাল বদলান না; অনেক সময় তিনি বদলান পুরো অভিজ্ঞতার কারণে।
একজন রোগী হাসপাতাল থেকে কী প্রত্যাশা করেন? তিনি চান সঠিক চিকিৎসা, অবশ্যই। কিন্তু তার পাশাপাশি তিনি চান সঠিক তথ্য, সহজ যোগাযোগ, সময়ের প্রতি সম্মান এবং এমন একটি পরিবেশ যেখানে তিনি বুঝতে পারেন—পরবর্তী পদক্ষেপ কী।
ধরা যাক, একজন রোগী প্রথমবার একটি হাসপাতালে গেলেন। চিকিৎসক ভালো ছিলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও পেয়েছেন। কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া কঠিন ছিল, কোথায় যেতে হবে তা পরিষ্কার ছিল না, একই তথ্য বারবার দিতে হয়েছে কিংবা পরীক্ষার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে কেউ ভালোভাবে বুঝিয়ে বলেননি।
চিকিৎসা ভালো হলেও অভিজ্ঞতাটি ভালো নাও হতে পারে।
আবার উল্টো ঘটনাও ঘটতে পারে। একজন রোগী হয়তো জটিল চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু হাসপাতালের কর্মীরা যদি তাঁকে পরিষ্কারভাবে তথ্য দেন, প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছাতে সাহায্য করেন এবং প্রতিটি ধাপে কী ঘটছে তা বুঝতে সহায়তা করেন, তাহলে কঠিন চিকিৎসা-যাত্রাটিও তাঁর কাছে তুলনামূলকভাবে সহজ মনে হতে পারে।
এখানেই রোগীর অভিজ্ঞতার গুরুত্ব।
একজন রোগী হাসপাতালে এসে শুধু চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করেন না। তিনি একটি পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেন—ফোন, ওয়েবসাইট, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, রিসেপশন, নার্সিং, ডায়াগনস্টিক, বিলিং, ফার্মেসি, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং শেষ পর্যন্ত ফলো-আপ।
রোগী কিন্তু এসব বিভাগ আলাদা করে বিচার করেন না।
তিনি পুরো প্রতিষ্ঠানটিকেই একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন।
আমার দৃষ্টিতে, এখানেই হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা যদি শুধু জানতে চাই—“চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে কি না”, তাহলে অভিজ্ঞতার একটি অংশই দেখছি। একই সঙ্গে জানতে হবে—“চিকিৎসা পাওয়ার পুরো পথটি রোগীর জন্য কতটা সহজ ছিল?”
ডিজিটাল মাধ্যম এই অভিজ্ঞতার প্রথম অংশ হয়ে উঠেছে। একজন মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার আগেই হয়তো চিকিৎসকের নাম খুঁজছেন, ওয়েবসাইট দেখছেন, চিকিৎসকের বিশেষজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইছেন কিংবা ফোন করছেন।
সেখানে তথ্য যদি পুরোনো হয়, খুঁজে পাওয়া কঠিন হয় অথবা এক জায়গার সঙ্গে অন্য জায়গার তথ্যের মিল না থাকে, তাহলে রোগীর মনে প্রথম অনিশ্চয়তা তৈরি হয় হাসপাতালের দরজায় পৌঁছানোর আগেই।
তাই একটি হাসপাতালের ওয়েবসাইট শুধু তথ্য প্রকাশের জায়গা নয়। এটি রোগীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি অংশ।
একইভাবে একটি ফোনকলও শুধু একটি ফোনকল নয়। রোগী যদি ফোন করে সঠিক তথ্য পান এবং পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে পারেন, তাহলে সেই কয়েক মিনিট তাঁর পুরো যাত্রাকে সহজ করে দিতে পারে। আর যদি তিনি বারবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যোগাযোগ করতে বাধ্য হন, তাহলে ছোট একটি সমস্যা বড় অসন্তুষ্টিতে পরিণত হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব সমস্যা সমাধানের জন্য সবসময় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হয় না।
কখনো একটি পরিষ্কার নির্দেশনা, একটি সহজ প্রক্রিয়া, সময়মতো একটি ফোনকল কিংবা একজন কর্মীর একটু মনোযোগই রোগীর অভিজ্ঞতায় বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
এই কারণেই রোগীর অভিযোগকেও শুধু অভিযোগ হিসেবে দেখলে হবে না। একজন রোগী কোথায় সমস্যায় পড়েছেন, কোন তথ্য পাননি বা কোন প্রক্রিয়াটি তাঁর কাছে কঠিন লেগেছে—এসব আসলে প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্যবান সংকেত।
একইভাবে রোগীর প্রশংসাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন অভিজ্ঞতাটি তাঁকে ভালো লেগেছে, কোন কর্মীর আচরণ তাঁকে স্বস্তি দিয়েছে কিংবা কোন প্রক্রিয়াটি তাঁর সময় বাঁচিয়েছে—এসব তথ্যও ভবিষ্যতের সেবা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর অভিজ্ঞতা তাই শুধু Customer Service-এর বিষয় নয়। এটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি, ব্যবস্থাপনা এবং ব্র্যান্ড—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত।
একটি বিজ্ঞাপন একজন মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারে। একজন চিকিৎসক তাকে চিকিৎসা দিতে পারেন। কিন্তু রোগী শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কথা কীভাবে মনে রাখবেন, তা নির্ধারণ করে পুরো যাত্রার অভিজ্ঞতা।
আমার কাছে একটি ভালো হাসপাতালের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—রোগীকে শুধু চিকিৎসা দেওয়া নয়, চিকিৎসা পাওয়ার পথটিকেও সহজ করা।
কারণ একজন মানুষ যখন হাসপাতালে আসেন,তখন তিনি শুধু একজন রোগী নন। তিনি একজন মানুষ, যিনি হয়তো উদ্বিগ্ন, ব্যস্ত, অসুস্থ অথবা পরিবারের কাউকে নিয়ে চিন্তিত।
তাই তাঁর সময়, প্রশ্ন, উদ্বেগ এবং প্রয়োজন—সবকিছুকেই গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
শেষ পর্যন্ত রোগী হয়তো হাসপাতালের সব যন্ত্রপাতির নাম মনে রাখবেন না। প্রতিটি বিভাগের নামও মনে রাখবেন না।
কিন্তু তিনি মনে রাখবেন—তাঁর প্রয়োজনের সময়ে কেউ কি তাঁকে বুঝতে সাহায্য করেছিল, তাঁর সময়কে সম্মান করেছিল এবং পরবর্তী পদক্ষেপটি সহজ করে দিয়েছিল কি না।
হাসপাতালের প্রতি আস্থা শুধু চিকিৎসার ফলাফল থেকে তৈরি হয় না; তৈরি হয় সেই চিকিৎসা পাওয়ার পুরো অভিজ্ঞতা থেকে।
আর এই অভিজ্ঞতাই অনেক সময় ঠিক করে দেয়—একজন রোগী শুধু একবার হাসপাতালে এসেছিলেন, নাকি ভবিষ্যতেও সেই প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করবেন।

