আরেকটি মহাকাব্যিক রাত, আরেকটি অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারতে বসা ম্যাচ শেষ মুহূর্তের জাদুতে ঘুরিয়ে দিল আর্জেন্টিনা। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে থ্রি লায়ন্সদের ২–১ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল বর্তমান চ্যাম্পিয়নেরা।
ম্যাচের ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে পিছিয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার মাত্র পাঁচ মিনিট আগেও ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ফাইনালের স্বপ্ন দেখছিল টমাস টুচেলের ইংল্যান্ড। কিন্তু ম্যাচের শেষ ভাগে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আক্রমণের জোয়ারে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে ইংলিশদের রক্ষণভাগ। ৮৫ মিনিটে এনসো ফার্নান্দেজ এবং যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের লক্ষ্যভেদে উল্লাসে ফেটে পড়ে আটলান্টার গ্যালারি।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে আগামী রোববার (১৯ জুলাই) নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ট্রফি ধরে রাখার ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা।
প্রথমার্ধে লড়াই শুধু ট্যাকলের, ছিল না শট
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও স্নায়ুযুদ্ধ টের পাওয়া যাচ্ছিল। প্রথমার্ধের লড়াইটি সুন্দর ফুটবলের চেয়ে বেশি ছিল শক্তির প্রদর্শন। মাঠের দখল নিতে দুই দলই বারবার ফাউলের আশ্রয় নেয়। প্রথম ৪৫ মিনিটে দুই দল মিলিয়ে ১৯টি ফাউল হলেও গোলমুখে কোনো শট নিতে পারেনি কেউ। ৩-৫-২ এবং ৪-৪-২ ফরমেশনের দাবা খেলায় মধ্যমাঠেই আটকে ছিল বল। আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেস ও ক্রিস্টিয়ান রোমেরো এবং ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসন প্রথমার্ধের চরম উত্তেজনার মাঝে হলুদ কার্ড দেখেন।
গর্ডনের চমৎকার গোল ও ইংল্যান্ডের স্বপ্ন
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের গতি পরিবর্তন করে ফেলে ইংল্যান্ড। ৫৫ মিনিটে বাঁ প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠে থ্রি লায়ন্সরা। মর্গান রজার্সের বাড়ানো চমৎকার এক চিপ ক্রসে পা ছুঁইয়ে এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে পরাস্ত করেন ইংলিশ লেফট উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডন। ডেডলক ভেঙে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফির স্বপ্ন দেখতে থাকা ইংলিশ সমর্থকদের গর্জনে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম।
শেষ ১০ মিনিটে রূপকথা ও মেসির জাদু
গোল হজম করার পর আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বেঞ্চ থেকে একের পর এক পরিবর্তন আনতে থাকেন। লিয়েনড্রো প্যারেডেসের জায়গায় নিকোলাস গনসালেস এবং শেষ দিকে নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকোকে উঠিয়ে লাউতারো মার্তিনেজকে মাঠে নামিয়ে আক্রমণভাগ অল-আউট করে দেন স্কালোনি।
ম্যাচের বয়স যখন ৮৫ মিনিট, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির লিওনেল মেসি ও এনসো ফার্নান্দেজ। ডি-বক্সের বাইরে থেকে মেসির বানিয়ে দেওয়া পাস ধরে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে দুর্দান্ত এক কোনাকুনি শটে ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন এনসো। আলবিসেলেস্তেরা ফেরে ১–১ সমতায়।
ইংল্যান্ড তখনো ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি। ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে অতিরিক্ত সময়ের খেলা চলছে। ৯২ মিনিটে (৯০+২) ডান প্রান্ত থেকে আরেকটি আক্রমণ শানান ৩৯ বছর বয়সী জাদুকর লিওনেল মেসি। ডি-বক্সের ঠিক মুখে ভেসে আসা নিখুঁত মাপা ক্রসে দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে জড়ান এসি মিলান স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজ।
ইংল্যান্ডকে স্তব্ধ করে দিয়ে শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নেরা।
ম্যাচ পরিসংখ্যান
| বিষয় | আর্জেন্টিনা 🇦🇷 | ইংল্যান্ড 🏴 |
| গোল | ২ | ১ |
| স্কোরার | এনসো ফার্নান্দেজ (৮৫’), লাউতারো মার্তিনেজ (৯০+২’) | অ্যান্থনি গর্ডন (৫৫’) |
| অ্যাসিস্ট | লিওনেল মেসি (২টি) | মর্গান রজার্স (১টি) |
| হলুদ কার্ড | লিসান্দ্রো (৪১’), রোমেরো (৫০’), দে পল (৯০+৪’) | অ্যান্ডারসন (৩৬’) |
| ভেন্যু | মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম, আটলান্টা | দর্শক ক্ষমতা: ৭০,০০০+ |

