যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জুনে হওয়া কাঠামোগত চুক্তি ইরানকে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বাড়তি সময় ও সম্পদ দিয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তার মতে, ভবিষ্যতে হামলা ঠেকাতে ইরানকে সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনাও চালিয়ে যেতে হবে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে গালিবাফ বলেন, ইরানের যুদ্ধকৌশলে সামরিক পদক্ষেপ ও আলোচনার সমন্বয় থাকতে হবে। এর মাধ্যমে এমন প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো বুঝতে পারে, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হবে না।
তিনি বলেন, শুধু আলোচনা ও চুক্তি করে কিংবা কেবল যুদ্ধ চালিয়ে ভবিষ্যতের হামলা ঠেকানো সম্ভব নয়। বরং ‘যুদ্ধ, আলোচনা ও প্রতিরোধক্ষমতা’—এই তিনের সমন্বয়ে এগোতে হবে। সামরিক সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে আলোচনার টেবিলে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে হবে।
গালিবাফের ভাষ্য, শক্তিশালী হয়ে ওঠার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের মনে ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে এমন ধারণা তৈরি করতে হবে, যাতে তারা দেশটিতে হামলার কথা বিবেচনা না করে।
তিনি আরও দাবি করেন, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া কাঠামোগত চুক্তির বিষয়ে আগে থেকেই তেহরান ধারণা করেছিল যে ওয়াশিংটন নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা নাও করতে পারে। এ কারণে চুক্তিটি দুই ধাপে সাজানো হয়েছিল।
গালিবাফের দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথমে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের পর যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করে ইরান। তিনি চুক্তিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘পরাজয়ের দলিল’ বলেও উল্লেখ করেন।
তার মতে, এই চুক্তি ইরানকে সামরিক শক্তি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সম্পদ দিয়েছে। এতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে।
গালিবাফ বলেন, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। দেশটির ভাষায়, ‘প্রতিরোধের ফ্রন্ট’-এর শক্তি, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় ঐক্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং জনসংখ্যাও প্রতিরোধক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সামরিক সক্ষমতা নিয়ে তিনি দাবি করেন, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে বর্তমান সংঘাতের সময় পর্যন্ত ইরানের আক্রমণাত্মক সামরিক শক্তি ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
গালিবাফ বলেন, প্রতিপক্ষের কাছে ইরানে হামলাকে অনাকাঙ্ক্ষিত করে তোলার মতো শক্তি অর্জন না করা পর্যন্ত যুদ্ধ, আলোচনা ও প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির এই কৌশল চলবে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করে ইরানের জনগণের বৈধ দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
চলতি বছরের ১৮ জুন পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কাঠামোগত চুক্তিটি হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া কয়েক মাসের সংঘাতের পর এ চুক্তিতে পৌঁছাতে পাকিস্তান ও কাতার মধ্যস্থতা করে।
চুক্তিতে সংঘাত বন্ধের পদক্ষেপ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং দুই দেশের অমীমাংসিত বিরোধ নিয়ে আলোচনা শুরুর বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়া এবং চুক্তির শর্ত পালন নিয়ে মতবিরোধের কারণে এর বাস্তবায়ন জটিল হয়ে পড়েছে।
ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিলসহ নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব নয়।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়লেও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে আলোচনা শুরুর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে তেহরান। তবে আলোচনার আগে ইরানের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে বলে তারা জানিয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলপথে সামুদ্রিক উত্তেজনা বেড়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটছে এবং ইরান তাদের অনুমোদনহীন বলে বিবেচিত নৌপথে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করছে।

