প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, শুধু প্রযুক্তি কিনে ব্যবহার করলে একটি দেশ সবসময় অন্যের ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়। কিন্তু স্টিম (STEAM—বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, শিল্পকলা ও গণিত) শিক্ষার মাধ্যমে প্রযুক্তি বুঝতে, নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী তা অভিযোজিত করতে এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সক্ষম মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারলেই প্রকৃত অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জন সম্ভব।
বুধবার (৫ আগস্ট) জাপানের ওসাকায় অনুষ্ঠিত আরটেক জেনারেল এক্সিবিশন ২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার এমন একটি ‘স্টিম’ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কেবল বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি শেখানোই লক্ষ্য নয়; বরং শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখানো, সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা বিশ্লেষণ এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক সমাধান তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলাই হবে মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি ৭ কোটিরও বেশি। বিপুলসংখ্যক শিশু প্রাথমিক শিক্ষায় অধ্যয়ন করলেও দেশের অর্থনীতি এখনও তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। একটি বহুমুখী, জ্ঞানভিত্তিক ও উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে প্রাথমিক স্তর থেকেই ‘স্টিম’ শিক্ষার শক্ত ভিত নির্মাণ করতে হবে।
জাপানের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে ববি হাজ্জাজ বলেন, মেইজি পুনর্গঠন থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন—উভয় ক্ষেত্রেই জাপান শিক্ষা, প্রযুক্তি, শৃঙ্খলা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বাংলাদেশও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে চায়।
তিনি জানান, সরকার বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক শিখন সংকট মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শিশুদের সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান ও মৌলিক দক্ষতা জোরদারের মাধ্যমে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি দৃঢ় শিক্ষাভিত্তি গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘স্টিম’ শিক্ষা বাস্তবায়নে সবসময় ব্যয়বহুল প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না। একটি শিশুর লাগানো গাছ জীববিজ্ঞান শেখার ল্যাবরেটরি হতে পারে। স্থানীয় পানির মান পরীক্ষা, বৃষ্টিপাত পরিমাপ, কাগজ দিয়ে সেতু নির্মাণ কিংবা নিজ এলাকার রাস্তা ও ড্রেনেজ সমস্যার প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান খোঁজার মতো কার্যক্রমও কার্যকর ‘স্টিম’ শিক্ষার অংশ হতে পারে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে গণিত ল্যাব, বিজ্ঞান ক্লাব এবং মৌলিক রোবোটিক্স শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে চায়। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ‘স্টিম’ শিক্ষা কার্যকরভাবে পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
আরটেক জেনারেল এক্সিবিশনে প্রদর্শিত শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষণপদ্ধতির প্রশংসা করে ববি হাজ্জাজ বলেন, এসব মডেল সহজ, ব্যবহারিক, মডুলার ও সাশ্রয়ী হওয়ায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সহজেই অভিযোজিত করা সম্ভব। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী ও বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নযোগ্য শিক্ষাসমাধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করাবে না; বরং সমস্যা শনাক্ত, বিশ্লেষণ এবং বাস্তবসম্মত সমাধান উদ্ভাবনে সক্ষম করে তুলবে। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, দ্রুত নগরায়ণ, খাদ্য নিরাপত্তা, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জ্ঞান বিনিময় ও উদ্ভাবনী চিন্তার কোনো বিকল্প নেই।
বক্তব্যের শেষে প্রতিমন্ত্রী আরটেক, অক্টোব্রেইন, অনুষ্ঠানের আয়োজক, অংশগ্রহণকারী ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের শিক্ষায় বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও সহনশীল, উদ্ভাবনী ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে ওসাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিনিধি, শিক্ষা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক অতিথি এবং আরটেক ও অক্টোব্রেইনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

