সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ঘরে তুললো বাংলাদেশ। যে-কোনো ফাইনালে ভারতকে এবারই প্রথমবার হারের স্বাদ দিলো লাল-সবুজের দল। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) মালদ্বীপের রাজধানী মালের জাতীয় স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারে ভারতকে ৪-৩ গোলে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
ভারতীয়দের নাটক আর নতুন কি, আজ সাফের ফাইনালেও হলো এমনই এক নাটক। টাইব্রেকারের চতুর্থ শট নিতে এগিয়ে এলেন বাংলাদেশের স্যামুয়েল রাকসাম। ঠিক সেই মুহূর্তে নাটকীয় দৃশ্য— ভারতের গোলরক্ষক সুরজ সিং হঠাৎই ব্যথায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাতে অবশ্য খেলার ছন্দে খানিকটা বিঘ্ন ঘটল, বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মনোযোগেও পড়ল প্রভাব। চিকিৎসা শেষে আবার পোস্টে দাঁড়ালেন সুরজ।
এরপর শট নিতে গিয়ে দুর্ভাগ্য— স্যামুয়েল রাকসামের জোরালো প্রচেষ্টা ক্রসবারে লেগে ফিরে এলো। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ভারত সমতায় ফেরে, স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-৩।
তবে নাটক এখানেই শেষ নয়। ভারতের পঞ্চম শটে ওমং দুদু বল পাঠালেন বাইরে। তখন জয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। সবার চোখ রোনান সুলিভানের দিকে। চাপের সেই মুহূর্তে অসাধারণ দক্ষতায় বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। আর তাতেই চ্যাম্পিয়নের আনন্দ ফেটে পড়ে গোটা স্টেডিয়ামে।
দুই দলের নির্ধারিত সময়ের ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হয় গোলশূন্য ড্রয়ে। এরপর সরাসরি চলে যায় টাইব্রেকারে। সেখানেই ভারতকে হারায় বাংলাদেশ।
টাইব্রেকারে বাংলাদেশের হয়ে সফলভাবে লক্ষ্যভেদ করেন মুর্শেদ আলি, চন্দন রায়, আব্দুল রিয়াদ ফাহিম ও রোনান সুলিভান। একমাত্র শটটি মিস করেন স্যামুয়েল রাকসাম।
অন্যদিকে ভারতের শুরুটা ছিল হতাশার। ঋষি সিংয়ের নেওয়া প্রথম শটটি ডানদিকে ঝাঁপিয়ে দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক ইসমাইল হোসেন মাহিন। এরপর অবশ্য ঘুরে দাঁড়ায় ভারত— মোহাম্মদ আরবাস, স্যামসন ও বিশাল যাদব সফল হন নিজেদের শটে। তবে শেষ সুযোগে ওমং দুদুর শট বাইরে চলে যায়। এরপর রোনান সুলিভান গোল করলে জয়ের আনন্দে ভাসে বাংলাদেশ।
বয়সভিত্তিক এই প্রতিযোগিতা এ পর্যন্ত অনূর্ধ্ব-১৮, ১৯ ও ২০— এই তিন ক্যাটাগরিতে এখন পর্যন্ত মোট সাতবার অনুষ্ঠিত হয়েছে আসরটি। এর মধ্যে চারবার শিরোপা জিতেছে ভারত, নেপাল দুইবার এবং বাংলাদেশ এবারসহ দুবার সেরার মুকুট পরেছে। এর আগে ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ।
সব বয়সভিত্তিক ক্যাটাগরি মিলিয়ে এবার চতুর্থবারের মতো ফাইনালে মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ ও ভারত। এর আগে ২০১৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৮, ২০২২ সালে অনূর্ধ্ব-২০ এবং ২০২৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ ফাইনালে প্রতিবারই হারের হতাশা সঙ্গী হয়েছিল বাংলাদেশের। তবে এবার সেই আক্ষেপ ঘুচল— প্রথমবারের মতো বয়সভিত্তিক আসরের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
এর আগে একাদশে একটি পরিবর্তন আনেন কোচ মার্ক কক্স। সানি দাসের জায়গায় শুরুর একাদশে সুযোগ পান আব্দুল রিয়াদ ফাহিম। সেমিফাইনালে নেপালের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে দারুণ ছাপ রাখা ডেকলান সুলিভানকে তবে এই ম্যাচে বেঞ্চে রাখা হয়। অন্যদিকে তার ভাই রোনান সুলিভান শুরু থেকেই আক্রমণে ছিলেন বেশ সক্রিয়।
ম্যাচের শুরুতেই আক্রমণের ঝলক দেখায় বাংলাদেশ। সপ্তম মিনিটে বাম দিক থেকে রোনানের নেওয়া শটটি ছিল দুর্বল, যা সহজেই সামাল দেন ভারতীয় গোলরক্ষক। পাল্টা আক্রমণে ভারতের রোহেন সিং ডান প্রান্ত ধরে কয়েকটি বিপজ্জনক ক্রস তুললেও বাংলাদেশের রক্ষণভাগ ছিল দৃঢ়।
১৩তম মিনিটে রোনানের দারুণ ক্রসে মিঠু চৌধুরীর হেড লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে আরেকটি সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি রোনান। প্রথমার্ধের শেষ দিকে কর্নার থেকে পাওয়া সুযোগেও গোলের দেখা মেলেনি। ইনজুরি সময়ে রোনানের সাইড ভলিটিও লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে গোলশূন্য অবস্থাতেই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে জয়ের খোঁজে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে দুই দলই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় কেউই গোল আদায় করতে পারেনি। বাংলাদেশের গোলরক্ষক ইসমাইল হোসেন মাহিন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামাল দেন ভারতের দূরপাল্লার প্রচেষ্টা।
৬৫তম মিনিটে বদলি হিসেবে নামেন ডেকলান সুলিভান। ম্যাচের শেষ দিকে ভারতের একটি প্রচেষ্টা উপরের জালে আঘাত হানে, আরেকটি সুযোগেও গোল করতে ব্যর্থ হয় তারা। ফলে নির্ধারিত সময়ে কোনো দলই গোল করতে না পারায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।
সেখানে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখান ইসমাইল ও রোনানরা। শেষ পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকারে জয় নিশ্চিত করে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে বাংলাদেশ।

