সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়তে পারে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে, এই বড় পরিবর্তনের সুবিধা সব গ্রেডে সমানভাবে মিলবে না। নতুন বেতন কাঠামোতে নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়িয়ে ভারসাম্য আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
গতকাল সোমবার জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইন সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও হিসাব মহানিয়ন্ত্রক এ কমিটির সদস্য।
বৈঠক শেষে কমিটির এক সদস্য বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় শুধু মূল বেতন নয়; বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও রয়েছে। কয়েকটি ভাতা একীভূত করার পাশাপাশি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কিছু সুবিধাও যুক্ত হতে পারে। চাকরিজীবীর অবসরকালীন সুবিধা ও পেনশন কাঠামো নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
এ ছাড়া, ভাতা সুবিধার বিষয়ে একাধিক এসআরও (বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ) জারি করার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সরকারের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরির লক্ষ্যে গঠিত কমিটি আগামী সপ্তাহে আরেকটি সভায় বসবে। এরপর সচিব কমিটির সুপারিশ পরের সপ্তাহে মন্ত্রিসভায় উঠবে। তবে মন্ত্রিসভা চাইলে সুপারিশে পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন করতে পারবে। অনুমোদন মিললে গেজেট জারির পর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীর ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো। সে কারণে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি বেতন রাখার সুপারিশ আসতে পারে। অন্যদিকে, প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি থাকলেও তা কিছুটা সীমিত হতে পারে। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বাড়তে পারে ৬০-৭০ শতাংশ, আর ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৯০-১০০ শতাংশ।
আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সময় পর নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে তারা শুধু মূল বেতন বৃদ্ধি নয়; মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধারও বাস্তবসম্মত সংস্কার প্রত্যাশা করছেন।
সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাজারের অন্যদের পরিস্থিতি কী, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত পে কমিশন একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। কিন্তু সেই সময়ের অর্থনীতির সঙ্গে বর্তমান অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন হয়েছে, সেটিও যাচাই করতে হবে। কারণ, বাজারে দাম বাড়লে সবার জন্যই বাড়বে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষিত হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর থেকে প্রতিবছর তাদের মূল বেতনের নির্ধারিত ৫ শতাংশ হারে বাড়লেও নতুন করে আর পে স্কেলের ঘোষণা আসেনি। ২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ ছাড়া বৈশাখী ভাতার হার বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ এবং যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বড় ধরনের সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ যা এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। বাজেটের ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

