যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানো এবং অপরিশোধিত তেল বিক্রির ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর বুধবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। এতে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, দুই দেশের নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়তে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ আবারও ব্যাহত হতে পারে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড জানায়, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাব হিসেবে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে। হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
গ্রিনিচ মান সময় ০১টা ২৮ মিনিটে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ফিউচার্সের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৩৮ ডলার বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ৫৪ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৩৭ ডলার বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৭১ দশমিক ৮১ ডলারে ওঠে।
ইরানের হামলার পর ইরানের অপরিশোধিত তেল বিক্রির অনুমোদন দেওয়া সাধারণ লাইসেন্স যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করায় মঙ্গলবার উভয় মানদণ্ডের তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে যায়।
‘বর্তমান সংঘাত বাজারকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচল এখনও কতটা অনিশ্চিত,’ বলেন এমএসটি মার্কির গবেষণা বিভাগের প্রধান সল কাভোনিক।
তিনি বলেন, ‘এটি বাজারে বিদ্যমান সেই ধারণার বিপরীত একটি সংকেত, যেখানে মনে করা হচ্ছিল অতিরিক্ত সরবরাহে বাজার ভরে যাবে। ফলে রেকর্ড পরিমাণ নিম্নমুখী দামের বাজি ধরা বিনিয়োগকারীদের অনেকেই তাদের অবস্থান বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এবং এই নৌপথে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের ৫০ শতাংশের নিচে থাকলে সরবরাহ সংকট তৈরি হবে, যা তেলের দাম আরও বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করার পর তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে নেমে আসে। একই সময়ে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে তেলের দাম আরও কমবে—এমন প্রত্যাশায় বিপুল পরিমাণ নিম্নমুখী অবস্থান গ্রহণ করেন।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে দীর্ঘদিন আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে আসবে—এমন প্রত্যাশাই তেলের দাম কমার প্রধান কারণ ছিল।
জাহাজে হামলার দায় ইরান স্বীকার করেনি। তবে কাতার এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে। হামলার শিকার জাহাজগুলোর মধ্যে কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজও ছিল, যেখানে একটি ড্রোন আঘাত হানলে ইঞ্জিন কক্ষে আগুন ধরে যায় বলে জানানো হয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানায়, ওমান উপকূলের কাছে সৌদি আরবের পতাকাবাহী একটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেটি ছিল ‘ওয়েদিয়ান’ নামের অতিবৃহৎ তেলবাহী জাহাজ। তবে কী কারণে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সমপরিমাণ পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। সাম্প্রতিক হামলাগুলো ওই নৌপথে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অবস্থান জোরালো করছে এবং জাহাজগুলোকে ওমানের কাছাকাছি পথের পরিবর্তে নিজেদের উপকূলঘেঁষা পথ ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সংঘাত শুরুর আগে যেমন ছিল, তেমনি এই নৌপথ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সরবরাহ ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন দেশ তাদের মজুত থেকে জ্বালানি ব্যবহার করে আসছে।
মঙ্গলবার বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী গত সপ্তাহেও যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত কমেছে। রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকেরা ধারণা করেছিলেন, ৩ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ২৪ লাখ ব্যারেল কমবে।
সুত্র: রয়টার্স

