বাংলাদেশে শুধু স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন হবে না; বরং বরাদ্দ করা অর্থের কার্যকর ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিকদের জন্য শক্তিশালী আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয়কর ব্যয় থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে বিদ্যমান ‘পরিবার কার্ড’কে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড’-এ রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘পাইনেট’ আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য বাজেট: অধিক বরাদ্দ ও সঠিক বাস্তবায়নের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির তুলনায় অত্যন্ত কম এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে উন্নয়ন বাজেট, যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য খাতের এই অদক্ষতার পেছনে খণ্ডিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, সেবার পুনরাবৃত্তি, ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, দুর্নীতি, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, ওষুধ সরবরাহে সীমাবদ্ধতা এবং সমন্বিত স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন ড. হামিদ। তিনি উল্লেখ করেন, ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বাজেট বৃদ্ধির দাবি করার আগে স্বাস্থ্য খাতকে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, বরাদ্দকৃত অর্থের পূর্ণ ব্যবহার এবং উন্নত সেবাদান সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে।’
বৈঠকে চিকিৎসায় আর্থিক সুরক্ষা দিতে বিদ্যমান ‘পরিবার কার্ড’কে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড’-এ রূপান্তরের প্রস্তাবকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে হাসপাতালে ভর্তি, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, দুর্ঘটনা ও জটিল রোগের চিকিৎসায় আর্থিক সুরক্ষার কথা বলা হয়।
প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য কভারেজের রূপরেখায় মধ্যম স্তরের স্বাস্থ্যসেবায় প্রতি পরিবারের জন্য বছরে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কভারেজ। এবং জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসায় প্রতি পরিবারের জন্য বছরে ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত কভারেজ।
এ ছাড়া কৌশলগত ক্রয় ও টেকসই অর্থায়নের লক্ষ্যে একটি ‘জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল’ (এনএইচএফ) গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সরকারি রাজস্ব, বিশেষ স্বাস্থ্য কর, মোবাইল গ্রাহক অবদান, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), উন্নয়ন সহযোগী ও দাতাদের সহায়তায় এই তহবিল পরিচালনার সুপারিশ করা হয়।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউএইচসি) অর্জনের জন্য শুধু ব্যয় বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; বরং দক্ষতা, জবাবদিহিতা, কৌশলগত ক্রয় এবং জনগণকে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় থেকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। তারা আসন্ন জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বাজেটকে জনগণের বাস্তব চাহিদাভিত্তিক ও ফলাফলমুখী করার ওপর জোর দেন।
পাইনেট–এর কো-অর্ডিনেটর নাজমুল হাসানের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন, ডা. মোসলেহউদ্দিন ফরিদ এমপি, সুলতানা জেসমিন জুঁই এমপি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. মো. আবু জাফর, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসাইন, অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম, সারোয়ার তুষার, দিদার ভূইয়াসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

